!! চলো মনসিজ , মানস ভ্রমণে !!

এটুকু পড়েই দূরছাই করে যেন লেখাটা ছুঁড়ে ফেলোনা , গজগজ করতে করতে ভাবতে বসো না , পাগল আবার খেপেছে !

মনসিজ, ইঁট কাঠ পাথরের এই অসহিষ্ণু নাগরিক জঙ্গল ছেড়ে, দু’দন্ড শান্ত , নির্মল হিমালয়ের প্রকৃতির কোলে মাথা রাখো , দেখবে – নাগরিক পঙ্কিলতার মাঝেও কিছুটা স্নিগ্ধ সুগন্ধ পাচ্ছো !
আজ তোমায় শোনাবো এক সবুজ তীর্থপথের কথা ……………

          আটপৌরে পৌরাণিক মতে , দেবতাদের খাস আস্তানা, গাড়োয়াল হিমালয় ! দ্বাবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান চেতনায় সমৃদ্ধ তোমার মত মানুষের এ মত মানতে হবে না । তুমি মনছবিতে আঁকতে পারো , সবুজের পরতের সাথে , তুষারশুভ্র গিরিশিখর একসাথে পাওয়ার এক আদিম ঠিকানার ছবি । যদিও অনেকে বলেন , দেবাদিদেব মহাদেবজীর নিরালা আস্তানাগুলোর মধ্যে এটা একটা বটে ।

চলো মনসিজ, মন শক্ত করে, উঠে পড়ো হরিদ্বারগামী যেকোন ট্রেনে। ইচ্ছে ডানা ভর করে, ভেসে যাক তোমার মনডিঙা, পঞ্চকেদারের মধ্যম কেদার মধ্যমহেশ্বরের পথে । তোমার পতিত নাগরিক মানবজমিন আবাদ হোক ! হাইটেক সমাজের দ্রুত বয়ে চলে যাওয়া সময় , একটু থেমে , ভালোবেসে সঙ্গ দেবে তোমাকে এপথে ।
দিনের আলো নিভে এলে, হর-কি-পৌড়ি ঘাটে , প্রদীপে-ধুপে গঙ্গারতীর মোহময়তা কাটিয়ে, পরদিন কাকভোরের হালকা ঠান্ডার চাদর গায়ে জড়িয়ে, উখিমঠগামী বাসের জানালার পাশে টুক করে বসে পড়ো। পাশ দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া সবুজ দৃশ্যগুলো তোমার মধ্যে ‘হিমালয়’ নামক পাগলামোকে ছড়িয়ে দেবে অনুরোমে। সেসব তুমি গ্রাহ্য করোনা , ওসব হল যাযাবর প্রজাতির আদিম ব্যাধি !

তোমার চোখের পাতা কি ভার হয়ে আসছে ? ঘুমের দেবী কি পরম মমতায়, স্নেহভরা পরশ ছড়িয়ে দিচ্ছেন তোমার শরীর জুড়ে ? এমনটাই হয় হিমালয়ের এই আঙিনায় চারধারে এলে । চোখ মেলো মনসিজ, দেখো – পথের ডানদিকে , অনেকটা নীচে, উত্তরপূর্ব থেকে বয়ে আসা অলকানন্দার সাথে , উত্তরপশ্চিম থেকে বয়ে আসা ভাগীরথীর মিলন । দুটো স্পষ্ট আলাদা রঙের জলধারা, মিলনের পরেও বহুদূর পর্যন্ত একরঙে লীন হয়নি । প্রকৃতির আশ্চর্য খেয়াল । নিদ্রাব্যাধি মুক্ত হও। এটা দেবপ্রয়াগ । প্রকৃতির অকৃপণ দৃশ্য প্রদর্শনীর সাক্ষী হও । নীল পাখি খুঁজে গেলো তোমায় , ফিরে গেলো চিরহরিৎ বনের আবছায়ায়।

পড়াটা বন্ধ করোনা মনসিজ । এটা মানসভ্রমণ । তোমার নাগরিক জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হবেনা তাতে ! এই চারণিকের চোখ দিয়ে একটিবার ঘুরে দেখো সুবিস্তারিত সবুজ আর তার নানা রকমফের । তোমাকে দেবার জন্য, এটুকুই পড়ে থাকে বিগত পৃথিবীর কাছে । সাদরে যদি না পারো , অবহেলায় তাকে দূরে সরিয়ে দিও না । বরং বলি , ‘একবার আজমাকে দেখো , ম্যহক জরুর ম্যহসুস হোগা’ !

এসো , এই মানস ভ্রমণালাপ কবিতায় জোরালো করি ——-

‘… এসো , বরং প্রক্ষিপ্ত হই গানে আর মেঘে ।
এখন লেগেছে ভালো ডানামোড়া কবোষ্ণ গৃহকোণ ,
ভালো এই অন্তহীন চেয়ে থাকা, জমছে যদি মেঘের
পরে মেঘ । চলো , ফিরি সেই বরিষণ শব্দ না জানা
কৈশোরে – সেই অকারণ মনস্তাপে ।
হ্যারিকেন আলো নিভুক দমকা হাওয়ায়, ফিরি
সেই টিনের ছাদে রাত্রিজোড়া অবিরল ধারাপাতে।
এখনো ডাকছো দূরে, তবু যাব না কোথাও ।
মান্ডুতে রূপমতীর জানালার কানাৎ ছুঁয়ে জল ,
দশাশ্বমেধে বিনোদমাঝির নৌকা টলমল —–
এসব প্রতীক্ষায় থাক । সুন্দর সকাশে আজ
বড় ভিড় , এসো আমরা বরং উল্টো টানে
ভাসি …..’                                                  (ক্যানভাস / জুলাই – অগাস্ট ২০০৩)

সেই উল্টো টানে , উন্মুক্তির আস্বাদ পেতে – চলো মনসিজ । দেখো – উখিমঠের আঙিনায় বাস এসে দাঁড়িয়েছে । বেলা শেষের তান বাজছে সিন্ধু – বাঁরোয়ায় । ধীরে ধীরে, বেলা শেষের সূর্য অস্তাচলে যাবার আগে, আকাশে রঙের খেলায় মেতেছেন। এসব তুমি তোমার নাগরিক জঙ্গলের আকাশেও দেখতে পাবে। তবে , সেটা একটু বিবর্ণ । ঘর ফিরতি ক্লান্ত রঙিন ছেঁড়া মেঘের দল – তাও দেখতে পাবে। শুধু তফাৎ তার বর্ণময়তায়, স্বাধীনতায়, উন্মুক্তির মাধুর্যে । ঊষামঠ আজ লোকমুখে উখিমঠ। কৃষ্ণপুত্র অনির্বাণ আর সূর্যপুত্রী (অন্যমতে , বাণরাজ কন্যা) ঊষার অসবর্ণ বিবাহ এই মঠে সংগঠিত হয়েছিল । এই দেশটার স্থানে অস্থানে যে সব নানান গল্প , লোককথা লুকিয়ে আছে , তার একটা শোনালাম মাত্র । মঠের স্থাপত্যকলার নন্দনতত্ব হাজির না করেও বলি , পারলে মঠটা দর্শন কোরো। আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে , হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান কালে , জগৎ গুরু শঙ্করাচার্য এই মঠ পূণনির্মাণ করেন। কেদারনাথজী, মধ্যমহেশ্বরজীর শীতকালীন আবাস এবং পূজাস্থল এই মঠ । মঠের অতিথিশালাতেও রাত গুজরান করতে পারো । তবে , চারণিকের পছন্দ, ভারত সেবাশ্রম । দিনরাত সুরের মূর্ছনা তুলে বয়ে চলা মন্দাকিনীর পাশেই ভারত সেবাশ্রম । সন্ধ্যার পর, নদীর উলঠোদিকের পাহাড়ের কোলে , গুপ্তকাশিকে দেখে , মাথার উপরে ফুটে থাকা ঝিলিমিলি তারাদের সাথে গুলিয়ে ফেলোনা যেন ! উখিমঠ বাজারের উত্তর দিকে চোখ রাখলে , দেখতে পাবে কেদারনাথ পর্বতের ধ্যানমগ্ন চূড়া ।

শরতের পেঁজা মেঘ , বেখেয়ালে ঘুরে বেড়ায় আকাশের এধার ওধার । শরৎ হলো হিমালয়ের বসন্ত ! ওসব যাযাবরী মেঘ দেখে তোমার মন যেন উচাটন না হয় ! ওদের দেখলে, যৌবনের কানাৎ ছোঁয়া আনমনা আবেগ, পা ধরে টান মারে ! বড় সব্বোনেশে টান সেটা ! ঘরমুখো হতে দেবে না আর কখনো ! তুমি কিন্তু ভেসে যেও না সে টানে ।

কিসের মুগ্ধতায় তোমার দু’চোখের পাতা অমন নিলাজ হলো মনসিজ ? দিগন্তে ওই সোনালী হিমশিখর দেখে , তোমার চোখের পলক যে আর পড়ছে না ! সম্বিত ফেরাও ! দিনের প্রথম যাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে যে !
উখিমঠ বাজার থেকে , যে কোন শেয়ার জিপের একটাতে বসে পড়ো । মদমহেশ্বর গঙ্গার ওপর তৈরী নতুন লোহার সেতু পেরিয়ে, উনিয়ানাতে নেমে পড়ো টুক করে । কি হলো ? থমকে গেলে কেন ? দু’ধারের সবুজ তোমাকে এখনই চলৎশক্তিরহিত করলো ? এখন থমকে থামার সময় নয় , সামনে আরো সবুজ বিস্ময় তোমার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে !
পৌরাণিক মতে , মানুষের মাথা হলো ব্রাহ্মণ, চরণদ্বয় শ্রমিক । তোমার ব্রক্ষ্মত্ব জাগ্রত হোক – সংগঠিত করো শ্রমিকদের। তুমি চারণিক হতে চলেছো । তোমার অপেক্ষায় রয়েছে নীলচে সবুজ নদী , রঙিন ফুলের রঙবাহারী কোলাজ, স্বাধীন ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখির কলতান, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ বুগিয়াল, চির তুষারাবৃত হিমশিখর আর হৃদয় মন্থিত পবিত্র নির্মলতা সহ , অতিথিপরায়ন গাড়োয়ালী মানুষ । কে যেন বলেছিলেন , ‘ভবঘুরে ধর্মের চেয়ে আর কোন বড় ধর্ম পৃথিবীতে নেই’ । তোমাকে ভবঘুরে হতে হবে না । কোথায় যেন লেখা ছিল , ‘চরৈবেতি’ । এগিয়ে চলো মনসিজ । দিনগত পাপক্ষয় থেকে কিছুটা মুক্তি আসুক তোমার ।

গুটিকতক বাড়ি , অল্প কিছু দোকানঘর, একটি মাত্র পোস্ট অফিস আর একটিমাত্র প্রাইমারী স্কুল নিয়ে তৈরী, শান্ত পাহাড়ী এই উনিয়ানা গ্রাম পেরিয়ে এগিয়ে চলো রাঁসির পথে। শুরু হোক পথচলা , শুরু হোক কথা বলা ………

শান্ত, অচঞ্চল , প্রশান্তি সহ বিরাজমান, কেদারখন্ডের এই অংশে , সমগ্র কেদারখন্ডের রক্ষাকর্তা (এমনটাই গাড়োয়ালী মানুষের বিশ্বাস) , মধ্যমকেদার অধিষ্ঠিত । তোমাকে স্বাগত তাঁর আপন দেশে । তোমাকে স্বাগত জানাতে ছুটে আসা কচিকাঁচার দল , শৈশবের মিষ্টি আবদারে , সরল নিষ্পাপ মুখে , মিঠাই চাইবে । বলবে – ‘নমস্তে’ । ডাক্তারখানা বা ওষুধের দোকান না থাকায় , বয়স্করা মাঝে মধ্যে মাথাব্যথা , জ্বর বা পেট ব্যাথার ওষুধ চাইতে পারেন । থাকলে দিও । চিকিৎসার জন্য ওঁদের বহুদূর যেতে হয় কিনা !

সমুদ্রের পাড়ে বসে , ক্রমাগত ধেয়ে আসা ঢেউয়ের পরে ঢেউ , যেন দূর থেকে দেখতে থাকা অন্য জীবনের ওঠানামা । নিজের সত্ত্বার কোন সম্পৃক্ততা যেন বা অনুপস্থিত সেখানে । কিন্তু , যেকোন পাহাড়ে একবার পৌঁছলেই , সে দাবি করে , সমস্ত সত্ত্বা সহ সম্পৃক্ত হবার জন্য । একটু না হয় দর্শনতত্ত্ব শুনলে – খুব একটা ক্ষতিকর নয় ।

পথের ডানদিক দিয়ে বয়ে চলা মদমহেশ্বর গঙ্গার ছলাৎছল – ছলাৎছল । যেন অবিরাম জীবনের প্রবাহমান ধারাপাত । কলকল করে , উচ্ছল কিশোরীর মতো , সারাক্ষণ গল্প শোনায় এ নদী , পথিককে । উপরি পাওনা হলো , অদেখা , অচেনা পাখির কলতান । মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেওয়া হিমালয়ের হিমেল হাওয়ার কোমল পরশ । পথচলার এই আনন্দটুকুর জন্যই হিমালয়ের বুকে মাইলের পর মাইল, চড়াই উৎরাই এর কষ্ট অগ্রাহ্য করে ঘুরে বেড়াবার অদম্য ইচ্ছে জাগবে । দূরে , পাহাড়ের কোলে, ধাপে ধাপে ধাপচাষের ক্ষেতজমি , চোখ কে আরাম দেবে । মানুষের উপস্থিতির অনুভব ছড়াবে মস্তিষ্কের প্রচ্ছন্ন প্রকোষ্ঠে । নদীর অন্য পাড়ে , সবুজ পাহাড়ে তখন জমে উঠবে আলোছায়ার মায়াবী খেলা । ঘন জঙ্গলের মধ্যে একফালি সবুজ ময়দান ভেসে উঠবে ভুস করে । এর মাঝখান দিয়ে, রূপোলী ফিতের মতো সরু , ঝরঝর ঝরণার সফেন জলরাশি , অনেক উঁচু থেকে, দামাল দস্যিপনায়, ঝাঁপিয়ে পড়বে মদমহেশ্বর গঙ্গার বুকে । এক স্বর্গীয় অনুভুতি ছড়াবে শিরা – উপশিরায় । ওসব অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিও না । ওসব অনুভূতি যাযাবর প্রজাতিদের জন্য । এগিয়ে চলো, ঘড়ি তোমাকে থামার সময় বলে দেবে । মদমহেশ্বর যাত্রাপথের শেষ বড় গ্রাম রাঁসি , তোমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। পাঁচ কিলোমিটারের এই চড়াই পথের ক্লান্তি তোমার দু’পায়ে । এখানকার অনেক হোটেল , লজ বা চায়ের দোকানের যেকোন একটাতে বসে , চা পানের বিরতি দাও। একটু আরাম পাক পা দু’টো ।

মূলতঃ রাকেশ্বরী দেবীর মন্দির কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা , পাহাড়ের ঘেরাটোপের মধ্যে থাকা , বর্ধিষ্ণু, বহু প্রাচীন এই রাঁসি গ্রাম । এখানকার পাহাড়ী ঢালান , ভালো আবাদী জমিন । গবাদি পশু আছে অনেক ঘরেই । সুপ্রাচীন, পাথর দিয়ে তৈরি, রাকেশ্বরী দেবীর মন্দিরের গঠনশৈলী, কেদারনাথ, তুঙ্গনাথ, মদমহেশ্বর, অনুসূয়া মাতার মন্দিরের মতোই । ওহো !! মন্দির গঠনতত্ত্ব আলোচনা বারণ – এটা ভুলে যাই বারেবার । মন্দিরের মূল তোরণের একধারে একটা হাঁড়িকাঠ – ওটা মানুষের পাশবীকতার কাষ্ঠিয় নিদর্শ । মূল তোরণের সামনে বাঁধা ঘন্টাগুলো বাজাও সজোরে । চারপাশের মৌনতা ভেঙে, ভাবগম্ভীর শব্দব্রম্হ ছড়িয়ে পড়ুক । মন্দিরের চাতালে বসে , প্রশান্তির আবেশে মন আবিষ্ট হলে , পূবদিগন্তে , দিগন্ত বিস্তৃত চিরতুষারাবৃত হিমশিখরের মৌনরূপ তোমার চোখকে আরাম দেবে ।

ক্ষয়রোগ থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় , চন্দ্রদেব এই মন্দিরে , এক কঠিন তপস্যায় নিমগ্ন হন । চন্দ্রদেবের সেই তপস্যায় তুষ্ট হয়ে, মাতা রাকেশ্বরী দেবী, তাঁকে ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত হওয়ার বর দান করেন। এখানে নিরন্তর প্রজ্বলিত ধূনি সেই তপস্যার সাক্ষী । সমগ্র কেদারখন্ডে এমন আরো দুটি অখন্ড প্রজ্বলিত ধূনি আছে । একটি কালীমঠে আরো আরেকটি ত্রিযুগীনারায়ণ এ । মদমহেশ্বরজীর ঢোলিযাত্রার সময় , ঢোলি একরাত এই মন্দিরেই থাকে। আরো একটা লোককথা বা পৌরাণিক গল্প – শুনলেই না হয় !

উঠে পড়ো । আর বসে থাকা নয় । গন্তব্য গোন্ডারের পথে তোমার পা পড়ুক । মেঘ দেখে ভয় পেয়ো না । এখানে মেঘেরা গাভীর মতো। পাহাড়ে বৃষ্টি খেলা করে যখন তখন। পথের দিকে চোখ রাখো – টানা উৎরাই নেমে গেছে মদমহেশ্বর গঙ্গার খুব কাছে। নামতে গেলে , হাঁটু বিদ্রোহ করতে পারে । ওটুকু সইতে পারলেই , তোমার চারপাশের আকাশছোঁয়া পাইন , ফার , দেওদার তোমার সাথে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে । পাথুরে পথের ঝরাপাতার নরম গালিচা পেতে দেবে নতুন বন্ধুর পথচলার জন্য । পথচলার অবর্ণনীয় এই অনুভূতি তোমাকে যেন আবেশে আবিষ্ট নাম করে – সেটা খেয়াল রেখো !

পথ কি কথা বলে মনসিজ ? মানুষের মতো , সেও কি তোমাকে খেরোখাতার পাতা পড়ে শোনাচ্ছে ? বলছে কি – এখানকার মানুষের ক্রমবিবর্তণের ইতিহাস ? কান দিও না । প্রত্নতত্ত্বে তোমার তো তেমন আগ্রহ নেই ।

এবারের পথচলা মানে , সামান্য চড়াই – উৎরাই পার হওয়া ! বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখো , এক ছোট নির্ঝরিণী , কালচে পাথরের গা বেয়ে , অনেক উঁচু থেকে , ঐ নিচের জলাশয়ের বুকে কেমন প্রবল আকুতি ঝাঁপিয়ে পড়ছে ! ঐ জলাশয় থেকে , স্রোতস্বিনী এক জলধারা, কিছুটা দূরে গিয়ে, মদমহেশ্বর গঙ্গার বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ! জলধারার দু’ধারে, এক অদৃশ্য মালির সাজানো অপরূপ ফার্ণের বাগানটা দেখো ! পরম যত্নে, সৌন্দর্য সৃষ্টির নিয়ত খেলার , তুমিও সাক্ষী থাকবে এই তীর্থপথে ! পথের ধারের বিশাল পাথুরে ওভারহ্যাং দেখে অবাক হয়োনা ! ঝড় – বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য , প্রকৃতির খেয়ালী সৃষ্টি এসব ! অন্যান্য প্রকৃতজদের মতো ওটা মানুষের জন্যেও ! এতে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কোন কারণ নেই ! শুধু মন প্রাণ দিয়ে প্রকৃতির রূপ-রস , গন্ধ-বর্ণ আস্বাদন করো ! তোমার মতো নাগরিক প্রাণ , যার থেকে আজন্ম বঞ্চিত ! সমাজ-সংসারের প্রসারিত হাতের দেনাপাওনা মেটাতে মেটাতে ক্লান্ত, রিক্ত , অবসন্ন , তোমার মতো প্রতিটি নাগরিক প্রাণ , প্রকৃতির এই লীলাপ্রাঙ্গনে দু’দন্ড সময় কাটালে , একবুক নির্মল নিঃশ্বাস নিয়ে, আরো কটা দিন পৃথিবীর বুকে বাঁচার আনন্দ খুঁজে পাবে !

     এখানে সময় বড় ধীর – আলসে ! তোমার নাগরিক সময়ের মতো দ্রুতগামী নয় ! এখানে প্রতিটি দিন, প্রত্যেকটা অন্যান্য দিনের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ! দু’চোখ মেলে , দু’পা বাড়িয়ে , সেই স্বাতন্ত্র উপলব্ধি করো ! অনুভূতি তোমার নিজস্ব স্বাধীনতা ! বিরক্ত হয়োনা ; তোমাকে ভাবরসে সিক্ত করার কোন ইচ্ছে আমার নেই !

গাঢ় কমলা আর মিশমিশে কালোয় মেশানো নাম না জানা পাখিটা , কয়েক পাক ঘুরে শিষ দিতে দিতে, কি বলে গেল – জানো ? বলে গেলো – ‘মনসিজ, গোন্ডার এসে গেলো ! আজ তোমার পথচলা শেষ !’ ওর দেশে তুমি অতিথি আর ‘অতিথি দেব ভবঃ’ – সেকথা ও পাখি জানে !

অতিথিপরায়ণ গোন্ডারবাসী তোমাকে আপ্যায়নের জন্যে প্রস্তুত ! গ্রামের বাড়িগুলোর যেকোন একটাতে থাকতে পারো ! রাস্তার পাশে হোটেলও আছে ! এসব জায়গায় , হোটেলের যেমন নাম হওয়া উচিত, তেমন নামের ‘হোটেল কৈলাশ’ -র অল্পদূর দিয়ে মদমহেশ্বর গঙ্গার স্রোতস্বিনী ধারা বয়ে চলেছে ! নদীর বুক থেকে , চির সবুজ গাছের জঙ্গল ভরা পাহাড় , সোজা উঠে গেছে নীল আকাশের দিকে ! দূরে , উত্তরপূর্ব দিকে , চলে গেছে মদমহেশ্বর যাওয়ার পথ ! একটানা চড়াই এর কাঠিন্য সহ ওই পথ তোমার প্রতীক্ষা করছে ! নিদ্রাদেবী চুম্বন করুন তোমার দু’চোখে ! রাতের বিশ্রামের প্রস্তুতি শুরু হোক তোমার !

সূর্যদেব তাঁর সাত ঘোড়ার রথে চেপে , যাত্রা শুরু করার আগেই , পথে নেমে পড়ো । আজকের চড়াই , হাঁফ ধরাবে তোমার কার্বন বিষ ভরা কলিজায়! ভয় নেই ! এই চড়াই চড়ার জন্য তোমাকে ‘জার্মান কি লড়াই’ লড়তে হবে না ! দু’কদম চলার পর বিশ্রাম নিও , খাঁটি অক্সিজেন তোমাকে হাঁফ মুক্ত করবে !

সূর্যদেবের প্রথম প্রকাশের সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে বাতাসে । তাঁর পূর্ণ প্রকাশের আকাঙ্ক্ষায়, চারপাশের প্রকৃতি বিনম্র শ্রদ্ধায় , নিশ্চুপ নিথর অপেক্ষায় অপেক্ষমান । ‘ওম্ জবাকুসুমঃ সংকাষেণ, কাশ্যপেয়ং মহাদ্যূতিম্ । ধন্তারিং সর্ব পাপোঘ্নম্ , প্রণতস্মি দিবাকরম্ ..’ । কান পাতো, চরাচর উচ্চারিত হচ্ছে এ মন্ত্রধ্বনি । না , না ; তোমাকে এ মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে না । অপরূপ আলোর আলপনা এঁকে রবিরশ্মি , সবুজ গাছগুলোর ওপর পড়ছে । গাছের পাতায় , শেষরাতের শিশির ফোঁটা , মুক্তোর লজ্জা বাড়িয়ে তুলছে । চারপাশের সুন্দর, নির্মল স্নিগ্ধতার মাঝে , প্রবাসমানা মদমহেশ্বর গঙ্গার কলধ্বনি শোনা যাচ্ছে!

অনেকটা চড়াই ভেঙেছো । পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখো – পাহাড় ঘেরা শান্ত , মৌন ছবির মতো , গোন্ডার গ্রামের ঘুমভাঙ্গা চঞ্চলতা । বাণতোলী খুব কাছেই । একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে, এগিয়ে চলো সেদিকে ।

মার্কেন্ডেয় গঙ্গা আর মদমহেশ্বর গঙ্গার মিলন ঘটেছে এই বাণতোলীতেই । এই মিলন , বাণতোলীর সৌন্দর্য আরো অপরূপ করে তুলেছে । ক্ষণিক বিশ্রাম নাও । এই মিলনের অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করো । মার্কেন্ডেয় গঙ্গার উপর দিয়ে, সেতু পেরিয়ে, পাহাড় প্রদক্ষিণ করে এগিয়ে যাওয়া পথটা , বড্ড চড়াই । রডোডেনড্রন , ফার্ণ, অর্কিড , পাইন, দেওদার এর ভরা জঙ্গল এ পথের দু’ধারে। এখনো আঁধারের আবছায়া কাটেনি পশ্চিম দিকের ঢালের এই পথে । তোমার চারপাশে পাইন পাতা আর ছালের স্নিগ্ধ সুগন্ধ, বুক ভরে টেনে নাও মনসিজ । নাগরিক প্রাণ সুগন্ধীত হোক ।

অনেকটা চড়াই ভেঙে, উঠে এসেছো । এই উচ্চতা থেকে ঐ নিচে , মার্কেন্ডেয় গঙ্গা আর মদমহেশ্বর গঙ্গার সঙ্গম , কি সুন্দর দেখাচ্ছে, দেখো চেয়ে । বড্ড চড়াই । গতি শ্লথ হয়েছে তোমার , হাঁপাচ্ছো । এই বৃদ্ধের হাত ধরো , চলো এগিয়ে চলি । ঐ দূরের পাহাড়ের ঢালের ওপর , বিস্তীর্ণ সবুজ বুগিয়ালের বুকে , আলোছায়ার লুটোপুটি খেলা চলছে । কোমল, সতেজ , স্নিগ্ধ সবুজ আর কখনো দেখেছো মনসিজ ? তোমার ক্লান্ত পা দুটোকে একটু বিশ্রাম দিও এবার । চোখ দুটো আরাম পাক এই সবুজতায় । এটা ‘খান্ডার’ । এমন নামকরণের কারন অবশ্য জানা নেই এই বৃদ্ধের । সামনেই ‘নানু চটি’ ।

নানু চটির, খড়ের চালওয়ালা একটিমাত্র চায়ের দোকানে চা এর ফরমায়েশ ঠুকে দাও। পিপাসা মিটবে । খড়ের চালার নিচে বসে , চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বহুদূরে , নিম্ন মদমহেশ্বর উপত্যকার, পিকচার পোস্টকার্ড সংস্করণ দেখে নাও দু’চোখ ভরে । তোমার উলটো দিকে ঘন জঙ্গলভরা পাহাড় । জীবনের চলার পথে মাঝে মাঝে, পেছন ফিরে, ফেলে আসা সবকিছুকে একবার দেখে নেওয়া খুব দরকারি । স্মৃতিরা সতেজ থাকে তাতে ।
উদরের আগুন নেভাতে , গরম গরম আলু পরোটা আর চা খেয়ে, বেশ কয়েক ঘর বসতির নানু চটির মায়া ত্যাগ করো দ্রুত । আরো ছ’কিলোমিটারের তীব্র চড়াই পেরোতে হবে তোমাকে ।

চড়াইয়ের কষ্ট কম করার জন্য এ পথের যাত্রীরা , মদমহেশ্বরজীর নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে , ক্লান্ত অবসন্ন পা দুটো টেনে নিয়ে এগিয়ে যান। ৪৫ ডিগ্রি থেকে ৬০ ডিগ্রি তীব্রতা সহ , এ পথ চলে গেছে ওপরপানে । এই নিঃশব্দ চরাচরে, হৃদপিন্ডের লাবডুব দামামা আর একটা দুটো পাখির তীক্ষ্ণ শিষের আওয়াজ, নৈঃশব্দ ভঙ্গ করবে ।
পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে উঠতে থাকো , চড়াই ভাঙ্গার কষ্ট কম হবে । এতে অতিরিক্ত পাওনা হতে পারে , পথের ধারে অবহেলায় ফুটে থাকা , নাম না জানা রঙবাহারী ফুলের ফুলেল সৌন্দর্য । কপাল ভালো হলে , দু একটা রডোডেনড্রন মিললেও মিলতে পারে।
না , না ! ওসব জয়ধ্বনি করে , প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হবে না তোমাকে !

সূর্যের আলো কম পড়ে বলে , সামনের পথ একটু স্যাঁতস্যাঁতে । অসংখ্য মর্স আর ফার্ণের জটাজালে আটকে থাকা দীর্ঘ সরলবর্গীয় গাছগুলো যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন। এই চরাচরে কি ঘটে চলেছে , যেন তার কোন খেয়াল নেই তাদের । এ এক অন্য জীবন । এদের বয়স জানতে চেয়োনা ।
অর্ধেক পথ পাড়ি দেওয়া সারা । সামনের চা গুমটিতে বসে , চা খেতে খেতে, জিরিয়ে নেওয়া যাক কিছুটা সময়। গতি মন্দ নয় তোমার ।
কিলোমিটারের হিসেব কষে মাথা ঘামিও না । সামনে সামান্যই পথ । ওই পাথরের ওপর জন্মানো অসংখ্য মর্সজাতীয় উদ্ভিদ যেমন করে শক্ত নিষ্প্রাণ নিরস পাথর থেকে রস সংগ্রহ করে বেড়ে চলেছে , তুমিও তেমনি করে নিজের ভেতরে রস সঞ্চার করো। ওই উদ্ভিদগুলোর মতো রসিক হও । শ্রান্ত দেহ টেনে নিয়ে চলো । মদমহেশ্বরজী তোমার প্রতীক্ষায় রয়েছেন । সামনের ওই বিস্তীর্ণ চির সবুজ বুগিয়ালের বুকেই, মদমহেশ্বরজীর আবাস ; তাঁর মন্দির । মন্দিরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে, বিনম্র ভাবে তাঁকে তোমার পৌঁছে সংবাদ দাও। বড় ব্যাকুল ছিলেন তিনি এতোক্ষণ ।

কি হলো মনসিজ ? ওমন চমকে উঠলে কেন ? এই স্বর্গীয় প্রাকৃতিক রমনীয়তা কি তোমার প্রতিটি শিরা-ধমনি, রোম-অনুরোমে আনন্দ লহরী তুললো ? স্বর্গের আস্বাদন দিলো ? এমনতরো চমকে ওটা কি অভিষ্ট লাভের সাফল্যে নাকি ভক্তিরসে ? আত্মহারা ভাবাবেগে চমকে উঠলে নাকি ? ওসব কি তোমাকে মানায় ? বরং , চারধারে চোখ বোলাতে বোলাতে বিশ্রাম নাও ! আগামীকাল সকালে মদমহেশ্বরজী কে দর্শন কোরো। অবশ্য , মাঝেমধ্যে এমনধারা ভাবাবেগ , সুস্থতার লক্ষণ !

সাত তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে উঠে পড়াটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছো দেখছি ! নাগরিক জীবনে ‘লেট রাইজার’ ছিলে বলেই তো জানতাম । যাকগে! চলো, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াই । সূর্যের প্রথম কিরণ এসে পড়ুক ১১,৪৭০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, মদমহেশ্বরজীর খাস তালুকে উপস্থিত দর্শনার্থীর শরীর-মনে । পূর্ব দিকের পাহাড়ের মাথায় , সদ্য জমা বরফের ওপরে, সূর্যের ছটা ধীরে ধীরে রঙ ছড়াবে। চরাচরে স্নিগ্ধ প্রশান্তি ছড়িয়ে
পড়বে। পার্থিব জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, অচঞ্চল ধ্যানমগ্ন, অচেনা অজানা এই স্বপ্নালু জগৎ । এর মাঝেই মদমহেশ্বরজীর মন্দিরের অবস্থান। এই বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে, নানা রঙের ফুল , রঙ ছড়ায় এপ্রিল মে মাসে । ঘন সবুজ পাহাড়ের ঘেরাটোপে, অপরূপ প্রাকৃতিক রমনীয়তার মাঝে থাকা , সুপ্রাচীন মদমহেশ্বরজীর মন্দিরের গঠনশৈলীও সমান অপূর্ব। সবুজ বুগিয়ালের মাঝখান দিয়ে পাথর বেছানো পথ , সোজা চলে গেছে মদমহেশ্বরজীর মন্দিরে। মন্দিরের পেছনে, ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে পান্ডুসেরা হয়ে নন্দীকুন্ড । সে অন্য গন্তব্য । তুমি বাধ্য নও সে পথে যেতে। মন্দিরের দরজা সকাল সাড়ে দশটায় খুলবে। ততক্ষণ ঘুরে বেড়াও মুক্ত বিহঙ্গের মতো।

মন্দিরের ভেতরে , চারকোণা কালো পাথরের উপর অবস্থিত , মহিষরূপী দেবাদিদেবজীর নাভিরূপী লিঙ্গটি, উত্তরদিকে হেলানো। কথিত আছে, তিব্বতের রাজার দুগ্ধবতী গাভী প্রতিদিন দীর্ঘপথ পেরিয়ে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে, এই শিবলিঙ্গের মাথায় দুধ ঢেলে ফিরে যেতো। রাজার সন্দেহ হওয়ায়, একদিন ঐ গাভীকে অনুসরণ করে, গাভীর কান্ড দেখে , রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে , তরবারি দিয়ে গাভীটিকে দ্বিখণ্ডিত করতে যান। গাভীটি সরে যাওয়ায়, তরবারি সরাসরি দ্বিখণ্ডিত করে নাভিরূপী শিবলিঙ্গটিকে । তখন থেকে শিবলিঙ্গটিকে এই অবস্থাতেই হেলে রয়েছে । এই মন্দিরের পেছনে হর-পার্বতী মন্দির । এসব দেখার জন্য ধর্মজ্ঞানী হবার দরকার নেই । দেখলে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে বলেও জানা নেই ।
আজ বিশ্রাম নাও । আগামীকাল যাওয়া যাবে বুড়া মদমহেশ্বর দর্শণে।

মদমহেশ্বর থেকে বুড়া মদমহেশ্বর প্রায় ১,০৬০ উঁচুতে অবস্থান করছেন। মদমহেশ্বর মন্দিরের পশ্চিমের পাহাড়ের ঢাল বরাবর, দেড় কিলোমিটার চড়াই পথ উঠে গেছে বুড়া মদমহেশ্বর মন্দিরের দিকে । শেষরাতের অসংখ্য মিটমিটে তারাদের সাক্ষী রেখে, পথে নেমে পড়ো । ভোরের আলো ফোটার আগেই পৌঁছতে হবে বুড়া মদমহেশ্বরজীর মন্দিরের দরজার সামনে ।

কয়েকটা মাত্র পাথর দিয়ে তৈরি এই মন্দিরের ভেতরে ছোট্ট শিবলিঙ্গ। ইনিই বুড়া মদমহেশ্বর । বিস্তারিত বুগিয়ালের মাঝে , বুড়া বাবার নিরাভরণ আবাস গৃহ । কিছুই নেবার নেই এই জগৎ সংসার থেকে তাঁর । এই বুগিয়ালের বুকে, খুঁজে পেতে , দু’চার টি ফুল পেলে , ইচ্ছে হলে পূজো দিতে পারো। ইচ্ছে না হলে ক্ষতি নেই । যঃ ধৃতি সঃ ধর্ম । ধারণক্ষমতাই ধর্ম ।

চেয়ে দেখো মনসিজ; তুমি হাত বাড়ালেই বন্ধু করে নিতে পারো চৌখাম্বা আর বদ্রি নারায়ণ পর্বতের সাথে । এতোটাই কাছাকাছি তোমার । একটু গম্ভীর প্রকৃতির বন্ধু, এই যা পার্থক্য । সূর্য কিরণে এখনি ধীরে ধীরে চৌখাম্বা, মান্দানী, বদ্রি নারায়ণ পর্বতচূড়া ঝলমল করে উঠবে। প্রথমে সোনালী তারপর রূপোলী জ্যোতি প্রভা ছড়িয়ে পড়বে সুনীল দিগন্তের প্রেক্ষাপটে । প্রথম রবিরশ্মি, সামনের পাহাড় টপকে , দিনের প্রথম আলো ছড়িয়ে দেবে ঢেউ খেলানো বুগিয়ালের বুকে । আরো কিছু পরে, নীল আকাশের ক্যানভাসে, চৌখাম্বার দক্ষিণপূর্ব ঢাল সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সৌভাগ্য কৃপা করলে , এই বুগিয়ালের বুকে জল জমে যে ছোট ছোট হ্রদ তৈরি হয়, সেগুলোর বুকে , চৌখাম্বার অনিন্দ্য সুন্দর প্রতিফলন দেখতে পাবে। পশ্চিম দিকে, বহু দূরে , নিচের দিকে দেখা যাবে মদমহেশ্বর তাল। মদমহেশ্বর তাল সম্পর্কে তোমাকে তো কিছুই বলা হয়নি । ভুলে যাওয়াটা , বৃদ্ধাবস্থার রোগ। ১৯৯৭ সালের প্রবল বৃষ্টি আর প্রলয়ঙ্কর ধ্বসে দুটো গ্রাম , ধ্বসের তলায় সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। মদমহেশ্বর গঙ্গার গতিরূদ্ধ হয়ে , এই বিশাল হ্রদের সৃষ্টি হয়। এটিই মদমহেশ্বর তাল। ইচ্ছে থাকলে ফিরতি পথে দেখে নিতে পারো।

উপলব্ধি করো – সর্বশক্তিমান নিয়ন্তা, অপরূপ রূপের ডালি নিয়ে, সমগ্র বিশ্ব চরাচর জুড়ে উপস্থিত রয়েছেন। নিজেকে ধন্য করো সেই উপলব্ধিতে ।
অনন্য সুন্দর এই প্রাকৃতিক শোভার মাঝে দাঁড়িয়ে, কি ভাবছো মনসিজ ? তুমি কি ভাবছো —
‘.. ইচ্ছে করে জীবনের জামা-কাপড়ের মতন যন্ত্রণাগুলোকে
একে একে নীল সমুদ্রের পাড়ে খুলে রেখে আসি।
তারপর ? তারপর তো লোকালয়ে ঢোকার কথা নয়।
বনবাস —-
যেখানে কোন যন্ত্রণা নেই । জানলা দরজা
তালাচাবি ।
তারই নাম স্বাধীনতা । তারই নাম উন্মুক্তি ।’                                   (— শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

 

নাগরিক জীবনের পথে পা বাড়াও মনসিজ ; অনেকটা পথ ফিরতে হবে যে !!

 

 

**********************************************************************************

 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *