ডেসটিনেশন বুগিয়াল

 

আজকাল মোবাইলটার ওপর ভয়ানক রাগ হয়, যখন তখন বেজে ওঠে, কাজের মাঝে এমন আওয়াজ বেসুরো ঠেকে।

“Hello” ? 
“এবার একটা নতুন রূট করতে হবে, মানে হল আনকমন রূট”
“আনকমন রূট ? কোন সময় ?”
“পুজোতে , অক্টোবর….”
“খুঁজে পেতে সেটাতো নিজেরাই বার করতে পারো, তাইনা ?”
“সেটা করে নেবো আমরা ,কিন্তু সাথী হতে হবে এবারে …”
“Okk চেষ্টা করবো..”

October এখনো অনেক দেরী । তাছাড়া ছুটিও একটা সমস্যা …

Bangalore  এর আকাশে বাতাসে পূজোর গন্ধ খুঁজে পাইনি আগের বছরও।

“Hi, when  will you go for the trek Sir ?”

সব্বোনাশ । 
সেপ্টেম্বরের শেষ প্রায় , টিকিটইতো কাটা হয়নি যাওয়ার। 
মোবাইলটার প্রতি প্রেম উথলে উঠলো। মোবাইল অ্যাপ.. ৩রা অক্টোবর সন্ধ্যের ফ্লাইট ….

নাহ ! এবারে ফোন করে  confirmation টা জানানো উচিত….

“Hello ! ৩ রা অক্টোবর , হাফ বেলা অফিস করে , সন্ধ্যের ফ্লাইটে পৌঁছবো । ৪ঠা অক্টোবর হাওড়া বড় ঘড়ির নিচে দেখা হবে । “

রূকস্যাকটার বয়স হয়েছে , আমারও, ওটা প্যাক করাই থাকে পরবর্তী ট্রেকের জন্য, তাই নো চিন্তা ।  শুধু একজোড়া  knee cap কিনতে হবে , 
“..হাঁটুতে আজ জং ধরেছে , জং ধরেছে গাঁটে গাঁটে, মধ্যবিত্ত শরীরে আজ সময় শুধুই ফন্দি আঁটে….”

বাগ এক্সপ্রেস এ টিকিট , তাই হেলতে দুলতে সন্ধ্যে ৬ টায় হাওড়া বড় ঘড়ির নিচে…
এ হতচ্ছাড়া মোবাইলটা ভ্যানভ্যান করেই চলেছে। অফিসের ফোন নয় তো ?

“ফোনটা ধরছো না কেন ?” 
“বাইরে এসো, লোড ফেরী করতে হবে..”

লোড ফেরী ? উড়ুউড়ু মেজাজে বাঙ্গালীর বসন্তে যাচ্ছি ট্রেক এ , এখানেও লোড ফেরী ?

“এতো বড় বড় দুটো ডাফেল, তিনটে গানি ব্যাগ… এতোসব কি ? কিসের আয়োজন ? কি আছে এতো সব ?”

“এক কয়েল ফিক্স রোপ, ৮ এম.এম ক্লাইম্বিং রোপ এক কয়েল , ৮ টা ক্যারাবিনার, ৮ টা আইস পিটন, ৮ টা রক পিটন , ২ টো জুমার, ২ টো হারনেস্ট, ২ টো আইস এ্যাক্স, ৩ টে টেন্ট, ক্র্যাম্পন, কোফলাচ, স্নোবুট….”

“থামো। এই গন্ধমাদন নিয়ে যাচ্ছিটা কোথায় ? কোন সমরাংগনে ?’
“ক্রমশ প্রকাশ্য ..”

অতএব লোড ফেরী…. 
রেল গাড়ী ঝমাঝম…..

thuni 1 thuni 2

৮ এ অষ্টবসু, ৮ এ অষ্টাদশী…
থুড়ি অষটাদশ কিশোর (!) , ১৩ এর গেরো ..
১৩ বছরের বালক (!) … সাথে ৬০% জীবন পার করা এক অতিবৃদ্ধ..

না না, এদের অবজ্ঞা করার দুঃসাহস আমার নেই, দেহলি পাস, পদাতিক পাস, কূয়াঁরী  ….  প্রচুর credential আছে এদের এই বয়েসেই …
তাই চুপচাপ, নেই চাপ । বাগ এক্সপ্রেস মানেই কুমায়ুঁ । Destination ঠিক কোথায় ঠাওর করতে পারছিনা। এটাই যা একটু চাপের। তাছাড়া অল্প কদিন আগেই মারাত্মক জ্বর থেকে উঠলাম। Antibiotic এর কড়া ডোজ এখনও জানান দেয় শরীর । মাঝেমাঝে , একঘেয়ে হাফ কেরানী জীবনে , এমনতর  surprise মৃতসঞ্জীবনীর কাজ করে ।

চলো ভোলা পাগলাটোলা..
চল পান্সি বেলঘরিয়া (থুড়ি ! কুমায়ুঁইয়া)

“লালকূয়াঁতে নেমে পড়াই ভালো, লোড ফেরী করার ঝামেলা কম “
“Ok ! Fine ! লালকূয়াঁতেই নামা যাক !”

উফ !! এতোখনে command করা গেলো  !

গন্ধমাদন নাবলো লালকূয়াঁতে  ! 

thuni
পুরোনো পাড়া , কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে চরে বেড়াচ্ছি এ-চত্বরে , খানিক জান-পহেচান তো থাকাটাই স্বাভাবিক ! সেটার কারনেই কি আমাকে সংগে আনা ? 
শোনো ভাবুক , এতো ভেবে কাজ নেই , হিমালয়ের কোলে দু’দন্ড চরে বেড়াতে পারবে , এটা কি কম কথা  ?

Correct ! আকাম্মা ভাবনায় কাম কি  ?

“इसबार बहोत जल्दी कुमाऊं में पहुंच गए ? कोई नया ट्रेक है क्या ?”

April তারপর  October ! প্রশ্নটা সংগত !

বিগলিত বদন … “ब्रेकफास्ट करवादो यार , भूक लगी है कस के ” 
“जी सर ! कोसी में खाना खा लेना ..”
“जैसा ठीक समझो ..”

thuni 1

thuni 2

বাগেশ্বরে সিদ্ধার্থ হোটেলে আমার খাতা চলে। বাকী বকেয়ার খাতা নয়,প্যার-মোহাব্বতের খাতা। অনেককালের কাস্টমার তাই বিসনেস কোড চালু আছে সেখানে। বিনসর ছাড়াতেই বেয়াদব মোবাইল অন করে ঠুকে দিলাম ফোন “रूम चाहिए , १०५ नंबर , शाम को पोहचेंगे ” ….
 
আপাততঃ পথের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাক…
পাইনের বুনো গন্ধ নাকে লাগছে, আঃ …
সতেজ সবুজের সুনির্মল গন্ধ…
কিন্তু ওই মেদবহুল দুটো ডাফেল আর পেটমোটা গানি ব্যাগ দুটো আমাকে অস্থির করে তুলছে মাঝেমাঝেই, এতসব কিসের জন্যে  ? কে বইবে এতো মাল ?
thuni 0
 
বাগেশ্বরে পৌঁছতে বেলা ৪ টে , রুম  রাখাই আছে , নিজেকে একটু সাফ্-সুতরো করে নেওয়া দরকার। আগামী কটাদিন তো আদিমতায় ফিরে যাবো।
 
“শোন, কাল সকালের  transportation এর ব্যাপারটা ঠিকঠাক করে রাখো, সকাল সকাল মুভমেন্ট করা হবে। “
 
Command is command, must have to obey. Especially when this one is for Himalayan Trek….. চলো গুরু, নেয়ে ধুয়ে বাইরে একটু টো-টো করে আসা যাক …..
 
“মনোহর সকাল ৪:৩০ এ গাড়ী লাগিয়ে দেবে..”
 
বাগেশ্বরে ঢুকলে , গোমতি আর সরযূ -র সংগমের কাছে দু দন্ড বসে থাকতে খুব ভালো লাগে, ফিরতি পথে এক কাপ গরমা গরম চা…
thuni 1
 
মাত্র ৭ দিনের ছুটি, হায়রে কেরানী জীবন !
যেতে আসতেইতো ১৪৪ ঘন্টা বরবাদ, হাতে থাকে মাত্র ৫টা দিন, কোন ছাতার ট্রেকটা যে হয় তাতে কে জানে ?
 
মোবাইলটা আবার সাত-সকালে পোঁ-পোঁ শুরু কেন রে বাপ ?
এক্কেবারে হাড় বজ্জাত , সাধের ঘুমটার মাঠে মারার কল..
 
“है मनोहर , बोलो ,,”
“तैयार हो जाओ, गाड़ी खड़ी है..”
“ब्यास , ५ मिनट ..”
 
সাকরেদরা ধরাচুড়ো পরে রেডী, আর আমি এখনো বিছানা বন্দী ? ছাঃ ছাঃ..
 
পুরোনো পথে আর কেউ যায় না, নতুন যুগ, নতুন পথ, শর্টকার্ট সফর.. খারকিয়া। বিনায়ক হলো স্বল্প উচ্চতার  pass…
চা চা করে মনটা… বিনায়কে বিনয়ী চা-পান .. বেলা বেশী নয় .. মাত্তর ১২ টা.. ঘন্টা ২ মদ্ধে পৌছে যাওয়া যাবে খারকিয়া ।
ওই ডাফেল আর গানি ব্যাগ দুটো আমার আর সহ্য হচ্ছেনা…
বেঢপ চেহারা ও দুটোর…
মোবাইলটা শান্ত, টাওয়ারের রেঞ্জের বাইরে, তথাকথিত সভ্যতার আগল ভেঙ্গে , অপার শান্তির দুনিয়ায় প্রায় ঢুকে পড়েছি , যেখানে মোবাইলের মোবিলিটি জিরো….
thuni 2
thuni 3
thuni 4

ডিজিটালাইজ দুনিয়া , ঘরে বসেই দুনিয়া দর্শন হয়ে যায় , কে আর কালঘাম ঝরিয়ে , শরীরের রক্ত-রস জল করে “দেখবো এবার জগত্টাকে……” বলে , লোটা-কম্বল নিয়ে বেরোতে চায় ?
চড়ে বসো চারচাকায় , হুস করে পৌঁছে যাও যেথা চাও…….

অথচ, আগে এ পথে আসার শেষ গাড়ী পথ শেষ হতো ভারারীতে, ৬ মাস আগে থেকে চিঠি পাঠাতাম “হোটেল গ্লেশিয়ার” এর মালিক কেদারনাথজীকে, পালা করে প্রতি সপ্তাহে একই বয়ানে লেখা পোষ্টকার্ড  ফেলে আসা হতো ডাকবাক্সে, বাটা কোম্পানীর কেডস্, কাপড়ের হ্যাভারস্যাক, হরিদ্বার থেকে আনা সেকেন্ড-হ্যান্ড মিলিটারী কম্বল….

তারপর একদিন সন্ধ্যের অন্ধকার মেখে “হোটেল গ্লেশিয়ার” এর অন্ধকার ঘুপচি ঘরে সেঁধিয়ে পড়া  …..পরদিন সকাল সকাল অন্ধকার গায়ে মেখে রাস্তায় নেমে পড়া, গন্তব্য.. সঙ… একদিনের  পারাওঁ…..

অথচ এখন  ? মুক্তিনাথেও গাড়ী চড়ে মস্ত ঘুরে আসা যায়, নো টেনসন , নো চাপ  ……

ধুস্ ! এতো বেশী পুরোনোতে গিয়ে লাভ নেই, আধুনিক হও বাবা !  ডিজিটাইলেসনের যুগ …..

খারকিয়া আসছে, বেশী দেরী  নেই , কিন্তু এ পথে কোন আনকমন রূট বাছলো এরা  ? সব রূটই তো চেটেপুটে সাফ  !  মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছে, এরা কিছুতেই মুখ খুলছে না  , এদিকে আমার অবস্থা সেটা সত্যি সত্যি “দিপু-দা” , “সি-মা-দি” মার্কা  …. চল পানসি বলে বেরিয়ে পড়া , স্যাকটাও  খুলে রি-চেক করিনি , নতুন চিজ একটাই  knee cap ….

খারকিয়া পুরোনো পাড়া, চেনা মুখ, চেনা চেনা পথ-ঘাট , চেনা আপ্যায়ন, চেনা রাজুর দোকান, চেনা চা, চেনা রোদ, চেনা মেঘ ….. আকাশের মুখ একটু ভার ভার …. “রাজু চায়” …

“জী বুবু…” 

এ চত্বরে  “ডিজেল বুবু ”  নামে সকলে পেছনে ডাকে আমায় , এটা  ওদের দেওয়া আমার  ‘নিক নেম ‘ … রহস্যটা পরে বলবো …মেজাজের বাঁধটা শেষমেশ ভেঙেই গেলো….. “যাচ্ছিটা কোথায় বলতো  ? এটা তোমার আনকমন রূট  ? এ পথের সবইতো সেরে ফেলেছো, একই রাস্তায় আবার করে টেনে আনার মানেটা কি  ?” … “বলবো বলবো  , আপাততঃ জাতোলী চলো, তারপর ঝাঁপি খুলবো ” 

জাতোলী ? ” 

thuni 0

thuni 1

খারকিয়ার এই ছোট্ট চা দোকান, হোটেল,গাড়ীর সারি পেরিয়ে মাত্র ২০০ মিটার ঢালানে নাবলেই এক অন্য দুনিয়া … জঙ্গলের পাতার খসখস, ট্রেক সু এর সাথে রাস্তার পাথরের  নিয়ত ঘর্ষনের আওয়াজ  আমাকে যেন কোন বাদশাহী মেহফিলখানায় নিয়ে যায়, কেমন যেন বাদশা বাদশা ভাব জাগে …. 

পেটমোটা গানি ব্যাগ, বেঢপ মেদবহুল ডাফেল মায় চিরসাথী রুকস্যাক সব খচ্চর সওয়ারী হয়ে জাতোলী পাড়ী জমিয়েছে, ঝাড়া হাত পা, গুড ম্যানেজমেন্ট মানতে হবে , ডাফেল আর গানি ব্যাগ  দুটো অসহ্য লাগছিলো সেই হাওড়া থেকেই আপদ বিদেয় আপাততঃ … 

সিধে মারবো টান , সোজা জায়কুনি , আনন্দের হোটেল আনপোনায় ডাবল চা , একটা সিগারেট  …. গাড়িতে ডিজেল ফুল … নেক্ষট স্টপ  রিটং …..

thuni copy

thuni 1 copy

thuni 3

thuni 2

…..ঢালানটা খতম , পুরোনো মডেলের টু-স্ট্রোক ইঞ্জিনের গাড়ীতে ডিজেল ভর্তি, সামনে হালকা পুলকা চড়াই, সুতরাং এগার নম্বরে যেই গিয়ার মারা ওমনি…. ‘আঙ্কেল’ .. কে রে বাবা ? এমন সময় পেছু ডাকে ? …..’থোড়া রুকো, হাম ভি সাথ চলেঙ্গে ‘ … মনোহর  ।  ‘গাঁও হো আতে হ্যাঁয়, আপকো ভি ডিজেল পিলা দেঙ্গে..’  দৌ তে পৈতৃক জমি-জায়দাত, থাকে সপরিবারে বাগেশ্বর , সুযোগ পেলেই দৌ, সোমরস সন্ধানে .. হিমালয়টা দেবতাদের জায়গা আর দেবতাদের সাথে সোমরস ডাইরেক্ট যুক্ত , মনোহর হিমালয় পুত্র , সুতরাং সোমরস জেনেটিক লোড .. নাহঃ এবারে মোবাইলটা বার করতে হবে, কানে ইয়ার ফোনটা গুঁজে, যেকোনো গানের ফোল্ডার চালাতে হবে , নাহলে মনোহরের বাক্য বন্যায় চড়াই এ ইঞ্জিন ফেল করবে…..

কি যে হচ্ছে বুঝতে পারছি না, পায়ের সুর-তাল কেমন কেটে যাচ্ছে, এমনতো কখনো হয়নি…ধুস্! গানে মনোযোগ দেই ‘ম্যাঁয় জিন্দেগীকে সাথ নিভাতা চলা গয়া, ফিকিরকো ধুঁয়ে মে উড়াতা চলা গ্যায়া’.. রফি সাব… আহাঃ।

কন্ডিশনালাল প্রোবাবিলিটির থিওরিটা ঝালিয়ে নেবো, নাকি ছোটবেলার কাটাকুটি খেলাটা শুরু করবো? এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেপেলেগুলো এতো সাসপেন্সে রেখেছে, চাপটা বাড়ছে । খুফিয়া ধৌর? রামধুরা? ভেড্ডুওয়ালাদের ঠেক? উনিয়ালদের ডেরা? পেটের ভেতরে খিস্তির শব্দকোষের পাতা ফরফর করে উলটে যাচ্ছে…নাহঃ, অঙকটা মিলছে না …

গট ইট! ট্রেলস্ পাস..আর নয়তো সুন্দরডুঙ্গা খাল…এ দুটোই বাকি ওদের.. এদুটোর যেকোন একটা…

তাই বলো । বাছা, এতো সাজগোজের পিছেকা রাজ? ইয়ে হ্যায় আপলোগোকা ইরাদা? শরীরটা হালকা লাগছে, পেটের গুড়গুড়ানি বনধ…পাঙ্গা নেওয়া? এসব প্ল্যান থাকলে বুঝবে শরীরে তেল কতটা?

… ওরা আসছে, ডিজিটাল যুগ, ডিজিটাল ফটোশুট সেশন কমপ্লিট করে আসছেন তেনারা, এসো বাবা,  এসো..সব কি মামা বাড়ীর মুড়কী নাকি? ‘…আনন্দ , ডাবল চায়,থোড়া কড়ক..’

thuni 1

thuni 2

thuni 3

অরণ্য এর ডাইরী থেকে

বাবাকে বেশ সাসপেন্সে রাখা গেছে ছটফট ছটফট করছে প্ল্যানটা জানার জন্যে এখন পরদা ফাস করা চলবে না, তাহলে বিগড়ে গিয়ে ব্যাক টু বাড়ী হবেই, নিশ্চিত অনেকবার বলেছি,বাবাএকটা ভালো রূট করাও কিন্তু প্রতিবারেই বয়সের দোহাই দিয়ে ১৭,০০০ফুটের ওপরে নিয়ে যায়না কিছুতেইতাই এবারে জানুয়ারী থেকে উঠে পড়ে খোঁজা শুরু করেছি আমি আর ভাই মিলে সব পুরোনো এ্যালবাম, স্লাইড , বাবার ডাইরী ঘেঁটে এই প্ল্যান বার করেছি কিন্তু বাবাকে বললে বাবা যাবেনা, এটা শিওর ছিলাম তাই গোপন করার খেলা ২০০৫ এরপর বাবা পথের এক ইঞ্চি জমিতেওপা রাখেনি একদম শেষের দিকে গিয়ে বলবো, তাতে ফেরার কথা উঠলে বাবা বলবেএসেছি যখন তখন আর এটুকু বাকি রাখা কেন ? চলো সেরেই ফেরা যাক ।’ বাবাকে তো চিনি

বাবার সাথে ট্রেক এ বেরিয়ে মজা আছে স্যাক পিঠে চাপালেই বাবা আর বাবা থাকেনা , এক্কেবারে বন্ধু হাওড়া ফেরা পর্যন্ত এটা চলে আরো সুবিধা হলো, কতগুলো রূটে ওসব গাইড-ফাইডের ঝামেলা পোহাতে হয় না তবে এবারে কেমন যেন একটা লাগছেবাবা  চলে গেছে অনেক্ষন , ধীরে সুস্থে হাটা বাবার ধাতে নেই, চড়াই পেলেই সোজা চড়াইয়ের মতো ফুড়ুত্…. চড়াইয়ের মাথায় পৌঁছে তবে থামাথামি , তার আগে নো স্টপ এবার যেন কেমন লাগলো, মধ্যপ্রদেশ বেড়েছে, কিছুটা ইন্দ্রলুপ্ত , হাঁটাটাও কেমন যেন  ঢিংচ্যাক ঢিংচ্যাক মার্কা, ঠিক বাবার ফর্মের সাথে মানান সই নয় হয়তো ব্যাংগালোর হাওয়া এর জন্যে দায়ী যাকগে, দেখা যাবে পরে… বাবার নেকস্ট  স্টপ জানা, তাই মিনিট কুড়ি পর পৌঁছলেও চাপ নেই, বাবা বসে থাকবে, চা চা করে যাবে … জায়কুনিতে আনন্দ দাদার হোটেলে ম্যাগি খাওয়া হলো , ভাইয়ের ফেভারিট, ওটা ওর চাই ই চাই, বাবা আরেকটা চা, কিছু হে হে মার্কা গল্প তারপর….

 বাবা বললো ‘এসো তোমরা, আমি আগে যাই’ .. দৌ তে গিয়ে খেম সিং এর দোকানে দেঁতো হাসি, হাতে চায়ের গ্লাস, ঠেক মারা বাবার স্বভাব… খাতি নালার কাছে পৌঁছে গেছি, বেলা পড়ে আসছে, শীতের রসদ জোগাড়ের কাজ সেরে মহিলারা ঘরে ফেরার প্রস্তুতি সারছে…. খাতি নালা পরিয়ে ১৫0 মিটার এগিয়ে বাঁ দিকের শর্টকার্ট নিলাম,বাবা রাস্তায় মার্কিং রেখে গেছে, ২০১৩ এর অক্টোবরে কানাকাঁটা করেছিলাম এ পথ ধরেই, তাই রাস্তাটা ভুলিনি..ভাই কানাকাঁটা করলো ১৩ বছর বয়েসে গত বছর ২০১৬ তে, বাবা ঠিক রিটং বুগিয়ালের সামনে পৌঁছে দাঁড়িয়ে থাকবে আমাদের জন্যে , ভাইকে তাড়া লাগালাম ‘তাড়াতাড়ি চল’..ও ছবি তুলতেই ব্যস্ত বিকেল প্রায় ৫টা, সন্ধে ৭টার আগে অন্ধকার নাববেনা, তার মধ্যে জাতোলী পৌছতে হবে, না হলে অন্ধকরে জঙ্গলে আমার প্রচুর ভয় রিটং গিয়ে বাবা আবার নন্দনসিং এর বাড়ীতে ঠেক জমাবে, বলবেধুস, আরতো মোটে ৫ কিলোমিটার, ফুস পৌছে যাবো, অতো চিন্তা কিসের ?’… আর ওরাও বাবাকে পেলে ছাড়তে চায়না… নন্দুদা আবার মাল খেয়ে একেবারে গদগদ  হয়ে যায় বাবার সামনে ..আমাদের বাড়ীতে বাবা নিয়ে এসেছিলো যখন তখন নিপাট ভদ্র লোক, ভাজা মাছ উলটে খেতে পারেনা …

snan

thuni 1

ওইতো ! বাবা অপেক্ষা করছে….

রিটং বুগিয়ালটা পার করে ডানদিকে ভাঙ্গাচোরা মারাত্মক বিপদজনক ঢালান, সোজা নেমে গেছে সুন্দরডুঙ্গা নালার পাশে , ওটার ওপর অস্থায়ী ব্রীজ, তারপর রিভারবেড ধরে , বোল্ডার টপকে  টপকে বাঁ দিকে গিয়ে ডানদিকে ট্রেভার্স করে রিটং নালা টপকে একটু ডানদিক বেঁকে একটা ছোট্ট চড়াই টপকে রিটং গাঁও …নন্দুদার বাড়ীর দাওয়ায় চায়ের মজলিস..

‘বাবা এবার ওঠো, সন্ধ্যে ৬ টা তো পার করে দিলে..’

‘চলো..’

রিটং ছাড়ালেই চড়াই শুরু, আস্তে আস্তে চড়াইটার রূপ খুলতে থাকে, জাতোলী পর্যন্ত টানা চড়াই , ৬ঃ১০ এ রিটং ছেড়েছি, সন্ধ্যে ৭ টা,  যা ভয় করেছিলাম ঠিক তাই …. ঝুপ সন্ধ্যে , জেট ব্ল্যাক অন্ধকার…দমফাটা চড়াই , তাও আবার এই আঁধারে..

‘বাবা..’

‘হেডল্যাম্প দুটো দুজনে লাগাও আর তোমার মোবাইলের টর্চটা অন করো… সিংগল ফাইলে চলো, আমাকে ডানদিকটা ছাড়ো…’

পেটজেল এর চারটে A+ ব্যাটারীর হেডল্যাম্প , কবেকার জানিনা, বাবা ব্যাকআপ ছাড়া মুভ করতে নারাজ,  হেডল্যাম্প এর আলো সোজা সামনের অন্ধকারকে ফালাফালা করে দিচ্ছে, ভয়টা কাটছে না…

এই রাস্তায় ভালুকের উপদ্রপ খুব,  জানি সেটা… বাবা ডানদিকে খাদ বরাবর, আমরা বাঁ দিকে সিংগল ফাইলে..

ট্রেক শুরু মানেই বাবার হাতে আইস এক্স, কতোবার প্যাক খেয়েছি, বাবার কোন হোলদোল নেই, এখন মনে বল বাড়াচ্ছে ওই আইস এক্স….হাতিয়ার ওটা… সন্ধ্যে ৮:১০ , আমরা রূপ সিং এর ছেলে চামু দাদার চায়ের দোকানে… একবারও দাঁড়াইনি টানা মেরেছি…

বাবা হাঁক পাড়লো  ‘..চামু ! চায় …’ জিব বেরিয়ে আসছে, গলা শুকনো কাঠ, জাতোলীতে ঘুম নেমে এসেছে , শুধু আমরা তিনটে প্রাণির শ্বাসের আওয়াজ .. ‘আ গয়ে আঙ্কেল ? সামান উধার রক্খে হ্যায়, পহলে চায় পি লো .. বহত লেট আয়ে আজ, বাত ক্যায়া হ্যায় ?’

‘চায় পিলা তু, বাদ মে ইয়ে সব…’

বাবার বরাদ্দ দুটো চা, আমরা আদা দেওয়া গরম চা, বাবা কুলকুল করে ঘামছে…

সিধে দূর্গা দাদার বাড়ীতে..

‘না ফোন, না কুছ খবর, বাত ক্যায়া হ্যায় ? কব্বু নে বাতায়া কে আপ আ রহে হো.. সাড়ে ছেয় বজে তক ওয়েট কিয়ে, ফির সোচা আপ নন্দুকে ঘর রহ গয়ে হোঙ্গে, কাল পৌঁছেঙ্গে সুবহ..’

‘খানা বনা, ফির লিডরসাব সে পুছনা ইয়ে সব..’

‘কোন লিডার..?’

আমরা রান্না ঘরে বসে পড়েছি ল্যাপটপ নিয়ে….আগামী প্ল্যানটা জবরদস্ত করতে হবে…

জাতোলী মানেই জম্পেস ব্যাপার, একসে বড় কর এক সব কুক,ফাইভ স্টার সেফ , কি দূর্গা দাদা, কি তারা দাদা , কি দূর্গা দাদার স্ত্রী (ওনার নামও দূর্গা).. এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ …

গরমাগরম বাজরার নরম চাপাটি, মাখনের মত ঘন ডাল, লম্বা দানার চালের ভাত, ঘরে তৈরী পনিরের তরকারী, মাঠ্ঠা, ঘরে পাতা দই, রাই শাক.. ফাইভ স্টার ডিনার …

রান্নাঘরের মাঝে চুল্হা ঘিরে খাওয়ার জোগাড় চলছে , বুকটা ধুকপুক করছে, এবারতো রূটপ্ল্যান বলতে হবে, কাল সকালে মুভমেন্ট.. দূর্গা দাদা বললো ‘..খেতিকা কাম বাকী হ্যায়, কাল পুরা হো যায় গা, পরশোঁ চলেঙ্গে, কাল সুবহ এগারা বজে মিটিং ফিক্স…’ , ভাই চিমটি কাটলো..

বিছানায় নরম গরম আমেজ , ‘… দাদাই, সেফ গেম এর টাইম পাওয়া গেলো রে..’

জাতোলীর ঘুম ভেঙেছে, সকাল হয়েছে অনেকক্ষন, রেস্টডে পাওয়া গেছে, তাই লেট লতিফ । রেস্ট ডে পাওয়া গেছে, তাই লেট লতিফ।  পাক্কা সকাল এগারোটা, দূর্গা দাদা, তারা দাদা হাজির, ‘….লিডরসাব, প্ল্যান বাতাও..’  ভাই আপারহ্যান্ড নিলো  ‘..পুরা নেহি, খালি বালুনি তক মানকে চলো, বাদ মে বাকী প্লান বাতাঙ্গে..’

‘..এ ছটু, এ্যয়সে ক্যায়সে হোগা, রেশন পানি, ইকুপমেন্ট, সব কুছ হিসাব করনা হ্যায় , পুরা রূট বাতাও.’ …অনেক কষ্টে ওদের সামাল দেওয়া গেল । লোড ডিসট্রিবুউশনের সময় দেখা যাবে ।

‘..জাতোলী টু জাতোলী পাঁচ মেম্বারকা দশদিন কা রেশন-পানি..’ , ‘…ঠিক হ্যায়, কাল সুবহ মুভ, সাম তক লোড বাঁট লেঙ্গে..’

‘..পাপা কাঁহা হ্যায়..?’ , ‘..বাজার মে গপ্পে মার রহে হ্যায়..’

মাত্র ২২-২৩ টা ঘর, তিনটে দোকান, একটা প্রাইমারী স্কুল , তার আবার মার্কেট ! বুঝলাম বাবা ঠেক জমিয়েছে !

ক্যালেন্ডারের ছবির মত গ্রাম জাতোলী । তিনদিক উঁচু পাহাড়ে ঘেরা ছবির মত গ্রাম । খেতে ফসল কাটাই চলছে , কিছু বাড়ীতে মেয়েরা চরস তৈরীতে ব্যস্ত.. রেশন পানি তুলতে সেই মার্কেট যেতেই হবে,মানে ছামু দাদার দোকান .. আন্ডওয়াল, জড়িবুটিওয়ালা মায় গ্রামের বাকী সবাই আর বাবা, ঠেক পুরো জমে গেছে.. এদিকের সব রূটের লেটেস্ট আপডেট নিয়ে চলেছে বাবা .. পারেও বটে!

‘..ইয়ে হ্যায় লিডার সাব..’

‘..এ আকাশ, তু লিডার বন যা রে ..’ ভাই অনেক ফেমাস এখানে ! এতো ছোট বয়স থেকে এসেছে আর এর বাড়ী তার বাড়ী  ঘুরে জমিয়ে ফেলেছে নিজের জায়গা ! আপাততঃ রেশন পানিতে মন দেওয়া যাক ..

জাতোলী মানে : দিনভর গ্রামের কাচ্চাবাচ্চা সহ গোটা গ্রামে মহামিছিল..

জাতোলী মানে : প্রত্যেক ঘর থেকে মহিলাদের দেওয়া খাবার ‘..খা লে বেটা..’ ..

জাতোলী মানে : এ তল্লাটের এক্ সে বড় কর এক্ পাহাড়ী শার্দুলের জন্মভূমি.. রাম সিং, শের সিং, ধাম সিং, রূপ সিং, পুস্করসিং, বলবন্ত সিং..

২০১৩, হিমালয়ান সুনামীর পর , অক্টোবরে কানাকাঁটা করে ফেরার সময় গোটা গ্রাম , সারাটা রাত ধরে জয়োল্লাসে মেতেছিল , দুটো বকরী কাটা হয়েছিল, গ্রামের সকলে মিলে গ্রান্ড পার্টি, নাচা গানা খানা পিনা .. উফ, ভুলবো না কোনোদিন..!!

নাহঃ, লোড  ডিসট্রিবিউট  করে ফেলতে হবে , কোনো চান্স দেওয়া যাবে না…

বিশেষ বেগড়বাই কিছু হল না , শুধু বাবা বললো ‘..বেজোড়ে যাবো না , চন্দু কে নিয়ে নাও..’

….শরীরে যেন ৪৪০ ভোল্টের কারেন্ট খেলে গেলো, ঠিক শুনলাম তো ? ‘..গুউউউড মর্নিং, গরম চায় ..’ ঝটকা মেরে মোটা গদ্দাটা সরিয়ে ভাইকে ডাকলাম , ‘..তোর কি মাথাটা গেছে ? লিডার কে ? বাবা ? না তুই ? চা রাখা আছে , ঝাড় খেতে না চাইলে তাড়াতাড়ি রেডী হ ‘

ফাইনাল লোড ডিসট্রিবুশন সারা , ‘..লিডার সাব, মোর্চা সামাল হো..’ হুইসেল মারলাম, ঘড়িতে সকাল ৬:১০ মি. । জাতোলীর বাড়ীগুলো থেকে সকালের চুহ্লার ধোঁয়া বেরোচ্ছে , বাতাসে হালকা বুনো গন্ধ , ফকফকে রোদ্দুর ..দূর্গা দাদা এক গোছা ধুপ কাঠি জ্বালিয়ে আবারও বললো  ‘মোর্চা সামাল হো লিডার সাব’

‘মুভ..’

দূরগা দাদার বাড়ী, ভূমিয়াল দেবতার মন্দিরকে বাঁয়ে রেখে , বাবা শর্টকার্ট নিয়ে নিয়েছে । রাস্তাটা সোজা হিট করবে , জাতোলীর একমাত্র ওয়াটার ট্যাঙ্কে গিয়ে । শুরুতেই এই খাড়াইটা না মারলে চলতো না ? থাকগে, সকাল সকাল ঝামেলা করে লাভ নেই । লোডটা একটু বেশী ঠেকছে । আস্তে আস্তে সয়ে যাবে । ভূমিয়াল দেবতার থান এর সামনে দূরগা দাদা পূজো দিলো, ধুপকাঠি গোছাটা গেঁথে বললো ‘য়াত্রা মঙ্গল..’ ..সাথে সাথে ভাই বললো ‘য়াত্রা মঙ্গল ডুয়ার্সে..’ এখন হাসা যাবে না, সিরিয়াস সিচুয়েশন …

‘..লিডার সাব, সিধে দুনিয়া ঢং  পে রোকনা, হো সকে তো সেরাই নালে পর । রাস্তা চুক নেহি হোনা চাহিয়ে, ফাইনল প্যাকিং করকে হাম লোগ পৌঁছঙ্গে, লাঞ্চ ওহিঁ পে হোগা ’

বিদায় জাতোলী, আবার কদিন পর দেখা হবে । হে ভূমিয়াল দেবতা, লিডারশিপের মানটা রেখো, প্লান যেন সাকসেস হয় …

ঘন্টা তিনেক আর থামার চান্স নেই, থিয়োরীটা জানা, গা থেকে গলগল করে ঘাম না বেরোনো পর্যন্ত নো স্টপ.. আর এ জঙ্গলে কে থামবে ? বাবার তো গাড়ী গিয়ার নিয়ে নিয়েছে । ১০০ মিটারের দূরত্ব, মুভমেন্ট প্রায় একসাথেই হচ্ছে ।

মানতেই হবে, ছোটবেলার গল্পের বইয়ে পড়া জঙ্গলের যে ছবি মনে আঁকা আছে , কুমায়ুনের জঙ্গল ঠিক সেই রকম, রহস্য রোমাঞ্চে ভরা, গায়ে কেমন শিরশিরানি হয় চলতে চলতে..

“Leader should be the last man ..” সুতরাং আমাকে পেছনে থাকতেই হবে । ফুল গিয়ার-আপ করা, কুলকুল করে ঘামছি, ভেতরের জামা চুপচুপে ভেজা, থামার উপায় নেই, মেম্বাররা আগে আগে, এই জঙ্গলে কে একা একা থামার রিস্ক নেয় ? বাবা সাপের মত চলনে চড়াই কাটছে ‘ক্রিসক্রস’ , ভাই ঠিক তার পিছে …

ধুস ! এবার থামার হুইসেল মারতেই হবে, আর পারা যাচ্ছে না ! সিটিটা মেরেই দিলাম ! রোয়াকে বসা কেওড়া ছেলেদের মতো সিটি, নো হুইসেল ! বেশ কার্যকরি এটা, হুইসেলের থেকে, অতি কষ্টে বাবার থেকে শেখা..

টিম দাঁড়িয়ে পড়েছে ! পারফেক্ট টাইমিং ! ভৈঁরো নালার সামনে এসে গেছি, বাবা স্যাক নামিয়ে ফেলেছে.. ‘কি রে? সিটি মারলি কেন ? দুনিয়া ঢং তো সামনেই’ এক ধমক লাগালাম ভাইকে ‘গিয়ার খুলতে হবে, আর টানা যাচ্ছে না’.. ‘ভালোই করেছিস দাদাই, ব্যাপক তেষ্টা পেয়েছে..’ ..জল ভরিনি জাতোলীতে , বাবা ওয়াটার বটলটা বাড়িয়ে দিল..নিঃঝুম চারধার, শুধু ঝিঁঝিঁ র ডাক চারপাশে, ঘড়িতে সকাল ৯ টা,  লেট মুভমেন্ট হচ্ছে , হোক গে লেট…

ভৈঁরো নালার যে রূপ আগেরবার দেখেছিলাম তাতে প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে পালাবার মতো দশা হয়েছিল, এবার শান্ত নিরিহ, বোঝার উপায় নেই ভৈঁরো নালা সত্যিই ভৈরব রূপ নিতে পারে.. জল ভরে নেই, তারপর মুভ…

ভৈঁরো নালা পেরিয়ে টানা চড়াই, আবার দুনিয়া ঢং নালা পেরিয়ে দুনিয়া ঢং ..বড়ো জোর ৪৫ মিনিট, সুতরাং ১০ মিনিটের রেস্ট নেওয়াই যেতে পারে । বাবা জমি জরিপ করছে…

সাড়ে ন টায় ভৈঁরো নালা ছেড়ে দশটায় দুনিয়া ঢং , বাবার পিক-আপের সাথে পাল্লা দিয়ে মার টান… আধ ঘন্টায় রাস্তা পার .. ১৫ মিনিট সেভ..

দুনিয়া ঢং বুগিয়ালটা খুব সুন্দর, কিন্তু জল নেই, থাকার, ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই..অন্ততঃ ১০ মিনিট বসা হবেই, বাবার প্রিয় জায়গা, আমাদেরও আরো রেস্ট..শুট-আউট দুনিয়া ঢং, জাতোলী থেকে মাত্র ৫ কি.মি..

‘..লিডার সাব, মুভ করো..’

সাড়ে চার খানা জবরদস্ত চড়াই, তারপরেই বাবা বোল্ডার রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে চোরবাটর ধরলো, কিছু বলা যাবে না পাথ ফাইন্ডার বলে কথা.. এতো লোড নিয়ে ডাউন মারা যায় নাকি ? নাহঃ, বেশী ডাউন না ..

সিধে ধলবাগড়..

২০১৩ র সুনামীতে রাস্তা যেন কেটে নেওয়া আইস-ক্রিম ..  একটু এদিক ওদিক করেছো তো সিধে ২০০ মিটার ফল, রিভার বেডের বোল্ডারের সাথে হেড অন কলিশন.. পুরো দ মারা দশা হবে ! হড়হড় করে নেমে গেলাম ..

বাবার হলোটা কি? নামছে না কেন ? ও কি ? বাবা লড়খড় করছে .. পায়ের তলার বোল্ডার সরকাচ্ছে.. কিছু করতে পারবো না, ভাইকে  ঝটকায়  টেনে নিলাম, ভাই চেল্লালো ‘বাবা হোল্ড !’

‘দাঁড়িয়ে যাও ৫ মিনিট, একটা সিগারেট টেনে নেই,সেরাই সামনেই..’ ট্রেক এর এর মাঝে যে সিগারেট টানে না সে আজ সেটাই করছে , ডাল মে কুছ কালা হ্যায় ‘ কি হয়েছে তোমার?’ ..

‘কিছু না, জুতোটার বয়স বেড়েছে.., চলো..’

কাঁটায় কাঁটায় ১২ টা, সেরাই নালা ক্যাম্প গ্রাউন্ড ..টেম্পোরারী উনোন রেডী, প্রেশারে বাবা চা বসিয়ে দিয়েছে,পরবর্তী আইটেম ভাইয়ের ম্যাগী, আমারও ভাগ আছে…

পাক্কা ১ ঘন্টা পরে ওরা এলো, ১০ মিনিটে ক্যামপ রেডী , ‘.লিডার সাব,আরাম করো..’ কিচেন রেডী, ধুপ সহ পূজো শেষ , এবার গরমাগরম পকোড়া , কফির সাথে টিম মিটিং…লাঞ্চ : খিচুড়ি, পাঁপড়, এগ ফ্যাটফেটি (আন্ডা ভুজিয়া, টার্মটা বাবার দেওয়া)….

সেরাই নালা আর সুন্দরডুঙ্গা নালা সংগম থেকে মাত্র ২০০ মিটার এগিয়ে সেরাই ক্যাম্প, এই যাত্রার ক্যাম্প – ১ । ডাইনে সুন্দরডুঙ্গা নালা (আসলে নদী) প্রচন্ড শব্দ করে নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে , এতোটাই শব্দ যে একে অন্যের সাথে কথা বলতে গেলে গলার রগ ফুলে ওঠে । নদীর টেনে আনা অসংখ্য বোল্ডারের রাজত্বের মাঝে একফালি নদীর বালিয়াড়ী আর সেটাই সেরাই নালা ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড । সারাটা দিন ধরে নদীর কলতান মনটাকে ফুরফুরে করে রাখে । অনেকেই জাতোলী থেকে সুন্দরডুঙ্গা একদিনেই সেরে ফেলেন । ‘আগে গেলে  কেউ প্রাইজ দেবে না ,পেছনে গেলে লাথিও কেউ মারবে না, তাই প্রতিটি জায়গার রূপ-রস-গন্ধ মনের মনিকোঠায় ভরতে ভরতে  এগিয়ে যাও, এতেই পথ চলার সার্থকতা..’ বাবার পেটেন্ট ডায়ালগ .. আমাদের ক্যাম্প তাই এমন সব বেয়াড়া জায়গাতেই হয় ।

ট্রেক রূটে কিচেনটা একটা অসামান্য জায়গা, আপাতঃ ব্যস্ততার মধ্যেও মস্তি করে সব সেরে ফেলা যায় । রূট প্ল্যান, টিম মিটিং, আজকের ভুলভ্রান্তি, পরবর্তী পথের চলার ছক…. সব ..

‘ট্রেকতো স্টার্ট হয়েই গ্যাছে, ক্যাম্প ১ ও রেডী, এবারতো তোমাদের প্ল্যানটা বাতলাও’ .. ‘ছোড়ো আঙ্কেল, বচ্চে হ্যাঁয়, ইনকো আপনা চাহত পুরি হোনে দো , বাপ কা জুতা যব বেটেকে প্যায়র পে লগ যায়ে তব বেটা বাপ বন যাতা, ছোড়ো অব..’  

সত্যি সত্যিই আমাদের পায়ে বাবার ট্রেক সু…

দূর্গা দাদা বাবার বিশ্বস্ত, তারা দাদা বাবার ফেভারিট , তারা দাদার শোল্ডার বিলে বাবাকে ফিদা করে দিয়েছে , যতক্ষন ট্রি লাইনে মুভমেন্ট হবে দূর্গা দাদার ফর্ম ততোক্ষন খুলবে না , ট্রি লাইন শেষ , বড় ডাফেল পিঠে লোড করে , পাহাড়ী চিতার গতিতে দূর্গা দাদা মুভ করবে,  অসম্ভব ঠান্ডা মাথা, সিচুয়েশন অনুযায়ী পাক্কা ডিসিশন লেনেওয়ালা, তারা দাদা পুরো হলিউডি ম্যাচো হিরো, চন্দু (চন্দ্রপল) দূর্গা দাদার বড়ো ছেলে, বাবার নাতি (!) .. এই হলো এবারের টিমের ফরমেসন , মোট ছয়জন, কিন্তু বাবার বেজোড় থিওরীটা ঠিক মাথায় খেলছে না ..

এক্কেবারে একটা আনকা টিমের আবদারে, ২০১৩ র   অক্টোবরের শেষের দিকে কানাকাঁটা অভিযান হয়েছিলো, পাঁচ সদস্যের দলে আমি বাদে বাকী তিনজনের জীবনের প্রথম ট্রেক, এক সদস্যের ওজন ৯৪ কিলো , হিমালয়ান সুনামীর পর আমরাই প্রথম টিম ও পথে, রাস্তা ঘাট বলে কিছু নেই , একের পর এক ছোট বড় নাম না জানা নালা ক্রস করে, ভৈঁরো নালা ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো, জীবনে প্রথম রিভার ক্রসিং হাতেনাতে শিখেছি সেবার, সত্যিকারের এ্যাডভেঞ্চার , ভৈঁরো নালা ক্রস করে চড়াই ভাঙ্গতে পারছি না, ভয়ে হাঁটু কাঁপছে সবার, লিডার সাহেব সোজা টিমকে টেনে নিয়ে বসালো দুনিয়া ঢং  সেবার, নো রেস্ট..একটা পোর্টারকেও চিনি না, তারা এলেন ৪৫ মিনিট পর , হাফ লাঞ্চ হলো সেখানে , ক্যাম্প পড়েছিলো মৌরখৈরীতে সেবার , তারপর কাঠালিয়া ক্যাম্প, বালুনি ক্যাম্প, মায় দেবী কুন্ড  পর্যন্ত কেউ লিডারের হাসি মুখ দেখেনি, ক্যাম্পে দুপুর থেকে ভয়ানক স্নো ফল, সবাই ব্যস্ত টেন্ট সাফ করতে, আমরা চার সদস্য টেন্টে  ক্যাবলার মতো বসে, বাইরে তুমুল ব্যস্ততা , অভিযান না ক্যানসেল হয় সেটাই আমাদের চার মক্কেলের আলোচনার বিষয় ..  বাইরে সোঁ সোঁ করে বেদম হাওয়া সাথে দোসর টনটন  বরফ .. টেন্টে শ্লিপিং ব্যাগের ভেতর ফেদার জ্যাকেট পরে সেঁধিয়েও ঠান্ডা বশ মাননো যাচ্ছে না, চা বা কফি চাওয়ার সাহসও কারো নেই, হঠাত্ বাইরে তুমুল হৈ হট্টোগোল মনে হলো, টেন্টের বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখার দম নেই, এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি এমন সময় হুড়মুড় করে রিজ টেন্টের ক্যানোপির চেন খোলার শব্দ , বড়ো সাইজের কেটলি নিয়ে একজন কালো , পাতলা চেহারার পোর্টার বিশাল হাসি নিয়ে সোজা ভেতরে এলেন  পেছনে পেছনে আরো তিনজন, সব শেষে সব কটা দাঁত বের করে লিডার সাব , মগ বেরোলো, কফিও গেলা চলছে কিন্তু হাসি রহস্য ফাঁস হচ্ছে না .. ‘আও, পরিচয় করওয়াতে হ্যাঁয় ইন জাঁবাজোসে, ইয়ে হ্যায় রাম সিং দাদাকে দো বেটে দূর্গা সিং অওর তারা সিং , ইয়ে হ্যায় শের সিং কে বেটা বিক্রম সিং , অওর আপ হ্যায় পুস্কর সিং কে বেটা দিনেশ সিং ..’ গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে, শ্লিপিং ব্যাগ ছেড়ে চারজনেই বেরিয়ে পড়েছি অজান্তে , টেন্ট ফুল গরম .. ‘এক টিম কানাকাঁটাকে লিয়ে আয়া হ্যায় ইয়ে পাতা থা , মগর যব আঙ্কেল কো দেখা তব মারকিট পে মিটিং মে তৈয়ারী পুরা হো গ্যায়া কে কৌন কৌন যায়গা টিমকে সাথ, শের সিং নে ইয়ে টিম বানায়া আপ লোগোকে লিয়ে , আঙ্কেল আয়ে হ্যায় টিম লেকে ওর কানাকাঁটা পার নেহি হুয়া তো জাতোলীকা ইজ্জত চলা যায়গা, চাহে কিতনা ভি তুফান আয়ে , ইসবার তো কানাকাঁটা হো কে রহেগা..’

সদ্য মাধ্যমিক দিয়ে উঠেছি, এই সব পাহাড় শার্দুলদের নাম আর তাদের গল্প এতো শুনেছি যে প্রায় মুখস্ত, দুটো দিন জাতোলী বসে ছিলাম,  পাঁচটা টিম ফেরত গেছে , কেউ কাঠালিয়া পার করে বড়ো জোর বালুনি পর্যন্ত গিয়ে ফেরত, রাস্তা নাকি দুঃস্বপ্ন, বাবার মুখ গোমড়া, পছন্দের একজনও  জাতোলীতে নেই তার ওপর এইসব  গল্প, তৃতীয়দিন সন্ধেতে বাবা ঢুকে বললো, টিম ভাগ হবে, সব মহিলা সদস্য, দুই পুরুষ সদস্য (তার মধ্যে ভাই একজন) জাতোলীতে থেকে যাবে,বাকী টিম ওপরে রওনা দেবে কাল সকাল ৫ টায়, তুমুল ঝগড়া, কিন্তু লিডারের ফতোয়া, তাই মেনেই নেওয়া হলো শেষমেষ , ঠিক হলো, যার যার স্যাক প্যাক হোক, ইকুইপমেনট – রেশন পরে ওরা নিয়ে ওপরে যাবে, কিন্তু “ওরা” যে কারা তা বাবা জানে না, কিন্তু প্রবল বিশ্বাস ওপরে ওদের সাথে মুলাকাত হবেই, দুনিয়া ঢং পর্যন্ত ল্যাপ ফিক্স, ওখানে ওয়েট করা হবে, যদি দু ঘন্টার মধ্যে “ওরা” না  পৌঁছোয় তাহলে ব্যাক । আমাদের কাছে ওসব নাম আর তার মাহাত্ম্য কোনো মানেই ক্যারী করেনি , কিছুই জানি না , যেমন কথা তেমন কাজ , দুনিয়া ঢং পর্যন্ত পৌঁছনো হরর  ফিল্মকে হার মানিয়েছিল সেবার । ছেড়ে দে মা, পালিয়ে বাঁচি দশা তখন । “ওরা” পাক্কা এক ঘন্টার মধ্যে দুনিয়া ঢং পৌঁছেছিলো, কিন্তু তখন থেকে আজ সকাল পর্যন্ত “ওরা” খুব দূরের কেউ । আর এখন আমাদের সামনে চার চারটে বাঘের বাচ্চা । দূর্গা দাদা জোব্বার পকেট থেকে বাবার পুরোনো ছবি , রাম সিং এর সাথে, বার করে দেখিয়েছিলো ,  সাথে আরো গল্প, কানে বাকি কিছু ঢোকেনি তখন , বরফ ঝড়ের ভয়, রাস্তার ফিকির তখন  হাওয়া , টেন্টের বাইরে বেরিয়ে তুমুল নাচানাচি । দূর্গা দাদা রইলো আমাদের পাহারায়, লিডার সাব সহ বাকি তিনজন বেরিয়ে গেলো লোড নিয়ে নাগ কুন্ড , যাতে আগামীকাল মুভমেন্ট স্মুদ হয় । লোড ফেরী কি বস্তু তখন জানলাম । সন্ধ্যে ৭ টায় ফিরেছিলো ওরা সাদা পোষাক নিয়ে ,  ডেলা ডেলা বরফ সারা গায়ে ।  যতোক্ষন ওরা ফেরেনি , ততোক্ষন দূর্গা দাদা  চা, কফি, সুপ, পকোড়া খাইয়ে, গল্প করে আমাদের চাঙ্গা করে দিয়েছিলো ।  দেবী কুন্ড ক্যাম্প জমজমাট , সুপার হিট । নাগ কুন্ড ক্যাম্পের পর থেকে এদের এক এক জনের ফর্মা দেখেছিলাম , মার্বেলের মতো হার্ড আইস নেগোশিয়েট করে কানাকাঁটায় ওঠা, তারপরে দু দুটো চিমনি ক্লাইম্ব ডাউন করে, বরফ  মাথায় করে পাথ্থরকুনিয়া ক্যাম্প রেডী করে  প্রথম রাউন্ডের সুপ ,কফি.. পুরো রিয়েল এ্যাডভেঞ্চার ফিল্ম । পাথ্থরকুনিয়া ক্যাম্প থেকে জাতোলীতে লাস্ট ম্যান ঢুকেছিলো রাত ৮ টায়,সেটা লিডার সাহেব । ৯৪ কিলোর  টিম মেম্বারকে এসকর্ট করে । আমরা বিকেল ৫ টায় জাতোলী ঢুকেছিলাম । সব শের রা ফিরে এসেছে গ্রামে, কে নেই ?  শের সিং, ধাম সিং, রূপ সিং, বলবন্ত সিং.. একে একে পরিচয়  হচ্ছে সবার সাথে ,  পুষ্কর সিং এর বাড়ীর দাওয়ায়  বড়ো উনোন রেডী,  চরম  ব্যস্ততা.. ল্যাস্ট ম্যান ঢুকলে বড়া খানা হবে আজ ..  অন্ধকার নামার আগেই সব বাড়ী থেকে  হ্যাজাক এনে রেডী, যত সোলার ল্যাম্প সব রেডী ..  

ঘরে আরাম করে ,জাতোলীতে থেকে যাওয়া টিম মেম্বারদের সাথে জমিয়ে গপ্পো ফাঁদছিলাম, সময়ের হুঁস ছিলো না.. আচমকা বিকট আওয়াজ , লেংচাতে লেংচাতে বাইরে বেরিয়ে বোঝা গেলো .. লিডার সাবকে নামতে দেখেছে ওরা । চারপাশ আলোয় আলোময় , সিটি , উদোম নেত্ত..

দুটো বকরী জীবন দিলো, কুমায়ুঁ রেজিমেন্ট থেকে রিটিয়ার্ড লোকের ঘর থেকে “শ্রীরামচন্দ্র” এলো, রাতভর উদ্দাম নেত্ত, গানা বাজনা খানা..  গ্রামের কেউ বাদ নেই, ছুড়ি-বুড়ি, কচি-কাচা, ছোকরা-বুড়ো সাথে ফুল টিম , সেরাস্য সেরা ক্যাম্প ফায়ার..  কারোর শরীরে ফুলের আঁচড় লাগেনি পুরো ট্রেকে, শুধু লিডার সাব ছাড়া…

কিন্তু এখনো মাথায়  ‘বেজোড়ে যাবো না’ কথাটা ঘুরছে , মানে কি কথাটার ? ভাই কে বললাম ..

‘তোর মেমারি সেল এ ময়লা জমেছে, হারপিক দিয়ে ওয়াশ কর, হিমালয়ে দূর্ঘটনা নিয়ে একটা বই বেরিয়ে ছিলো তাতে ত্রিদিব বসু-র একটা লেখা পড়ে বাবা চেল্লাতে শুরু করেছিলো, বিলকুল ঠিক বিলকুল ঠিক বলে, মনে নেই তোর ?’

মনে পড়েছে, সেই আর্টিকেলটার মোদ্দা কথা ছিলো, পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে হিমালয়ে দূর্ঘটনার কবলে পড়া সব কটা দলেই বেজোড় সংখ্যার সদস্য ছিলো । ‘আমরা এখন ছ জন, জোড়ে চলছি, অতো ভাবার নেই’ …কাল সকালে মুভমেন্ট, মাথায় খট লেগে গ্যালো….

পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হলো ক্যাম্পের সকাল, এমন জমদার ঠান্ডায় শ্লিপিং ব্যাগের সাথে কোথায় জমাটি প্রেম হবে তা না, কাকভোরে (কাকেরা তখন জাগে কিনা জানি না) ফৌজী কমান্ডারের মতো শমন  “গুউউউউড মরররনিইইইং , চায়য়য়..”

….ঘুম, প্রেম এসবের সব্বোনাশ , শমন মানে শমন, ১ ঘন্টা সময়, পারলে নাম্বার ১ নাম্বার ২ করে রেডী হও নয়তো থাকো পড়ে । বোধহয় রবিঠাকুরের একই রকম এক্সপেরিয়েন্স তাই লিখেছিলেন “..তুমি ডাক দিয়োছো কোন সকালে কেউ তা জানে না..” আমরা হাড়ে মজ্জায় জানি কে ডাকলো । সেরাই ক্যাম্প ডিসমেন্টালিং চলছে, ঘড়ি বলছে সকাল ৫:৩৫, তারা দাদা বা দূর্গা দাদা বলবে ‘মোর্চা সামাল হো লিডার সাব’ , হুইসেল বলবে ‘একবার চুমু খাও’, স্যাক বলবে ‘দাঁড়িয়ে কেন পিঠে নাও’, পা বলবে ‘আর একটু দাঁড়ালে হতো না’…কমন, সব কমন ব্যাপার, মগজ বলবে ‘বি কুল ম্যান..’ বাবা স্যাকটা টেনে একটা বোল্ডারের ওপর রাখবে , তারপর ১৯৬০ এর দশকের প্রেমিকের মতো স্যাকটাকে গান শোনাবে ‘চলো ইকবার ফির সে, আজনবি বন যাঁয়ে হম দোনো’ , ওটা তো গান নয় মেশিনগান …

চললাম সেরাই ক্যাম্প, ফিরতি পথে তোমার সাথে কথা হবে,…বাই , হ্যাভ আ নাইস  ডে..

‘কি রে , এবারেই তো  কানাকাঁটা করে গেলি, রাস্তা কি আগের মতোই ?’.. ভাই বললো “কুল ম্যান, রাস্তা এখন আমুল বাটার, ঘপ সু মারবি , টপ টপকে যাবি, নো টেনশন..” বেড়ে পাকা! ১৩ বছরে ৬৩ র মতো হাবভাব, বাবা ওকে তোল্লাই দিয়ে পাকিয়েছে.. মুভমেন্ট চলছে..রিভার বেডের  টন টন বোল্ডার টপকানো ভয়ানক বিরক্তিকর, এ যে অনন্ত সমুদ্দুর…

ওরা ক্যাম্প গোটাবে, বর্তন সাফ করবে, লোড রি-এ্যারেঞ্জ করবে তারপর আসবে, মোটামুটি ৪৫ মিনিটের মামলা, আমরা মার্চিং চালু রাখব , প্রতিটি রক, বোল্ডার, মাটির  নিত্তি , আনা, পাই হিসেব করতে করতে বাবার ১১ নং গাড়ী চলবে,সামনের তিনটে ঘন্টা আমাদের হাড়মাস ভাজাভাজা হবে..সব কমন !!

‘দাদাই, শুনছিস..?’ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি .. ‘তুমনে পুকারা ওর হাম চলে আয়ে, জান হাথেলি পর লে আয়ে রে..’ মানে রূটে গড়বড় , রূট চ্যালেঞ্জ করা মানেই বাবার কমন সং.. ‘কি রে বলছিলি যে আমুল বাটার রাস্তা ..’ পুরো রকফল জোন, রাস্তা কৈ ? রিভার বেড থেকে খাড়া উঠে গেছে, ২০১৩ র থেকে কোনো অংশে কম না , ‘লিডার সাব, রূট নিকল গ্যায়া, যিস রূট পে হম চলেঙ্গে, উস রূট হি লে না, রুকনা মানা হ্যায়’ মাথাটা গরম হয়ে যায়, ট্রেকে এলে বাংলা ভুলে যায় লোকটা, ভাই বেরিয়ে গেলো , এবার আমার পালা , লোড টানছে পেছন দিকে , পায়ের তলার মাটি হুড়মুড় করে নেমে যাচ্ছে নদীর দিকে , ওপর থেকে বোল্ডার চুমু খেতে নামছে হনহনিয়ে … ‘হো গ্যায়া পার..’ এতো খনিকের স্বস্তি .. চলছি কি চলি নি , কেষ্টর বাঁশির মতো সুন্দর ঢুঙ্গা নালা ডাকছে ‘ওরে আয় আমার বুকে আয় বাছা ..’ সিটির আওয়াজ মনে হলো, মুভমেন্ট স্টপ করার সিটি .. তিন মুর্তিমান হাজির , ‘সিংগল রোপ পে মুভ হোগা, পহলে লোড, উসকে বাদ টিম..’ কমান্ড এখন বাবার হাতে !  বেরিয়ে গেলো তিনজন, বাবা, দূর্গা দাদা আর চন্দু, আমাদের সামনে শুধু তারা দাদা , সুন্দরডুঙ্গা নালার গর্জন ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই , প্রায় নদীর জলের ওপর দূর্গা দাদা ভেসে উঠলো টপ করে, সিটি, পালটা সিটিতে নির্দেশ আদান প্রদান  হচ্ছে, আমরা চুপ । তারা দাদা বললো ‘মুভ করো লিডর সাব’ .. ভাইয়ের পালা, তারা দাদা ওকে হাত ধরে দূর্গা দাদার কাছে পৌঁছে ব্যাক করলো, ভাই  হারিয়ে গেলো কোন আবডালে.. নদীতো পেরোলাম সেফলি, এগুতে না এগুতেই গধেড়া, দম ফেলার যো নেই, আবার একই কারবার, লোড চালান, রূট ক্লিয়ার , সেফ ট্রানসফার.. ‘অব টেনশন নেহি, রূট ক্লিয়ার কাঁঠালিয়া তক..’

‘ক্যায়া হুয়া ? সিটি কিঁউ মারা ?’  ‘ডন এর গাড়ীর ডিজেল খতম, গাড়ীতে তেল ভরে রওনা দেবে, এতো চাপ নিস না দাদাই, ১২ টার মধ্যে কাঠালিয়া ক্যাম্প লেগে যাবে ..’  দুকাপ গরমাগরম কফি সাথে পকোড়া , মা অন্নপূর্নার ভান্ডারা যেন । আহাঃ, কি স্বাদ ! হাতে অনেক সময়  সবে বেলা ১০ টা, আগামী ২ ঘন্টায় হেলতে দুলতে কাঠালিয়া পৌঁছে যাবো, শেষের দিকে চড়াইটা একটু চড়চড় করবে এই যা । ইতনে বড়ে সফর কে লিয়ে ইয়ে ছোটামোটা চিজ হোতা রহতা হ্যায় ।

কাঠালিয়া ঢোকার আগে আরো তিনটে গধেড়া ফেটেছে নতুন করে । এরা শান্তি দেবেনা দেখছি। দূর্গা দাদা, তারা দাদা, চন্দু, আমি আর ভাই গল্প করতে করতে চলছি, বাবা চলে গেছে । ক্যাম্প রেডী থাকবে, কফি, সূপ রেডী হয়ে আমাদের ডাকবে.. সুতরাং গপ্পো মারো যত খুশি…. কাঠালিয়া দেখা যাচ্ছে, রূপ সিং এর ডেরাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে , কিন্তু ক্যাম্প ? কোনো নাম ও নিশান নেই ক্যাম্পের । লাইন ছেড়ে তারা দাদা বেরিয়ে গেলো বন্দুকের গুলির মতো , আকাশে এক পোচড়া কালো মেঘ ..  

‘সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল, এভরি থিং নর্মাল, রূপ সিং কা ডেড়া আজ কা ক্যাম্প, কিচেন রেডী, কফি রেডী , আরাম ফরমায়া যায়..’

‘আঙ্কেল, আজ রাত আলু পড়াঠা, মশালা আন্ডা..’ উহু, যেন আমিনিয়ায় স্পেশাল ডিস এর প্রিপারেশন..

তারপর আবার কমন সব ব্যাপার, বাবা জল আনতে যাবে, কিচেনে তোড়জোড় চলবে, আমরা ডায়েরী লিখবো, আগামীকালের প্ল্যান তৈরী করা হবে, নতুন করে গিয়ার আপ…     

‘তারা, আইস এক্স নিকাল, উপর যানা হ্যায়, নালা বন্ধ হো গ্যায়, পানি নেহি আ রাহা হ্যায়, উপর কুছ গড়বড় হ্যায়, এ তারা…’

মুহুর্তে লন্ডভন্ড কান্ড , পিন্ডারার বাক্স খুলে ঝপাঝপ আইস এ্যাক্স , খুখরী, লাইন, টেপ নিয়ে তিনজন হরিনের গতিতে বেরিয়ে গেলো, লিডারের কোনো ভুমিকাই নেই, বাবা রিজটা ধরে ওপরে উঠছে দৌড়তে দৌড়তে, পিছে ওরা তিনজন, আমি ক্যাবলাকান্ত..  আপাতঃ শান্ত উপত্যাকায় ব্যোরোমিটারে ঝড়ের সংকেত..

‘দাদাই, ট্রেক পুরো জমে ক্ষীর, চল আমরাও ওপরে যাই.. দাঁড়িয়ে লাভ নেই, চল..’

একটা বিরাট আইবেক্স কোনো কারনে ওপর দিয়ে নালা পেরোতে গিয়ে পা পিছলে নালায় জীবন দিয়েছে, সম্ভবতঃ গতকাল রাতে ঘটনা, এখনো টাটকা , তিন জনেই নেমে পড়েছে নালায়, ঝড়ের গতিতে আইবেক্সটার পেছনের দুটো রাং আমাদের হতে উঠে এলো ।  ‘লিডর সাব , আজ শিকার বনেগা….’  বেচারা আইবেক্স !

সুন্দরডুঙ্গার মানে সুন্দর+ডুঙ্গা (পাথর), সৌন্দর্য নিয়ে লেখার দম কলমে নেই আমার, মাইকতোলী (মাই কি তোলী), পাঁওয়ালীদূয়ার, মৃগথুনি সকলে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে, চার চারটে গ্লেশিয়ার রিভারের সংগম এখানে, সুন্দরডুঙ্গা নালা, মাইকতোলী নালা, মৃগথুনি নালা আর সুখরাম নালা..

অনেকগুলো রূটের এন্ট্রি পয়েন্ট এটা, মাইকতোলী বেসিন, বাড় গ্লেশিয়ার, সুন্দরডুঙ্গা খাল (গিবসন কল), মৃগথুনি গ্লেশিয়ার, পাতাকী পাস বা পদাতিক পাস বা কানাকাঁটা পাস, বালজোরী কল, দেবীকোট, থারকোট, ভানুটি বেস ক্যাম্প.. আরো কত..

দারুন দারুন গল্প চালু আছে এই উপত্যকা ঘিরে….

রূপ সিং এর ডেরাকে বাঁ হাতে রেখে, ঘড়ির ঘন্টার কাঁটাকে ১২ টার ঘরে রাখলে চোখ যেদিকে স্থির হয়, সামনে সেই পাহাড়টার নাম খনখনিয়া, ডানদিকে চলে গেছে মাইকতোলী বেসিন যাওয়ার পথ, কোনো এক সুদূর পেছনে ওখানে নাকি দেবতারা যাঁতায় আটা (বা শষ্য) পেষাই করতেন। একবার এক আন্ডওয়াল (বা আনয়োয়াল, যারা উচ্চতর হিমালয়ের বুগিয়ালগুলোতে পশু চরাতে আসেন) অভুক্ত অবস্থায় খাবারের খোঁজ করতে করতে এখানে এসে পড়েন। দেবতাদের চিনতে পারেন নি বেচারা, দেবতারা তাকে খাবার দেন এবং এই বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন । আন্ডওয়াল এক সময় ফিরে আসে নিজের গাঁয়ে, কথায় গল্পে ওই কথা সে বলে ফেলে পড়শিদের, আচমকা অসুস্থ হয়ে মারা যায় সে। তারই মতো গাঁয়ের অন্য আন্ডওয়ালরা  পরে ওখানে যায় বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে, তারা গিয়ে আটা (বা শষ্য) পেষাইয়ের বাকী সব প্রমাণ চোখে দেখেন কিন্তু পেষাইকারীদের কোনো চিন্হ মাত্র দেখতে পান না। কুঁমায়ুনি ভাষায় খনখনিয়া র অর্থ শষ্য পেষাইয়ের জায়গা।

আরো আছে গল্প : একবার এক হতদরিদ্র আন্ডওয়াল তার শতছিদ্র ,ভেড়ার লোমের তৈরী কোটটি সুন্দরডুঙ্গা নালায় ধুচচ্ছে আর নিজের দারিদ্রতার জন্য নিজেকে অভিসম্পাত করছে, দেবতাদের সাকিন খুব কাছেই, তাঁরা আন্ডওয়ালের এই দশা দেখে ব্যাথিত হলেন, আন্ডওয়াল লোমের তৈরী কোটটি জল থেকে তুলে দেখে সেটি সোনার হয়ে গেছে। সে ছুটে তার ডেরা থেকে আরো কিছু ছেঁড়া কাপড়চোপড় এনে জলে চোবাতে যায়, নদীর পাড়ে রাখা সোনার কোটটি পাড়েই রাখা, আচমকা নদীর প্রবল স্রোত ওটি ঝটকায় টেনে নিয়ে যায় , শীত নিবারনের একমাত্র সম্বলটি ভেসে যায় নদীর টানে, সোনার লোভ তাকে সবহারা করে দেয় এক লহমায়.. বেশ কিছুদিন পর, অন্য আন্ডওয়ালরা তার মৃতদেহ দেখতে পায়, প্রবল শীতে মৃত্যু । বিনা বস্ত্রে শীত কেড়ে নিয়েছে প্রাণ…

সুন্দরডুঙ্গার এই তল্লাটের সব পাহাড়ই জাতোলীর মৌরসীপাট্টা। জাতোলীর পশুচারন, জড়িবুটি, কিড়া ঘাস, আরো যাযা হিমালয়ের নিজস্ব খাজানা তার সব কিছুতেই জাতোলীবাসীদের হক এখানে…

বাইরে ওলে পড়া শুরু হয়েছে…..  

কাল রাতে ছোটখাটো মিসাইল হামলার উপক্রম হয়েছিলো, ভাই দুটো এ্যান্টি মিসাইল ছাড়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে ‘..বোলা না ? বালুনী তক মানকে চলো , …তো বালুতি তক চলো..’

সকাল ৩:৩০ এ উঠে চা বসিয়ে দিয়েছি, ৪ টেয় হুইসেল মারবো, ৫ টায় মুভ । আজ লম্বা ল্যাপ। বালুনিতে টিম তো টপ করে পৌছে যাবে , কিন্তু তারপর ?  পিকচার তো তব চালু হোগা! বাইরে জমাটি ঠান্ডা । নো দন্ত মর্জন, নো নাম্বার ১-নাম্বার ২, যা করার সব বালুনিতে। সকাল ৫ টা , রূপ সিং এর ডেরার বাইরে জমজমাট অন্ধকার, শুধু একটা উটকো প্রশ্ন ‘ব্রেকফাস্ট?’ তুরন্ত জবাব, ‘চানা হ্যায় না..’ । ট্রেকাররা তো ঘোড়ার অন্য ভার্সন, চানা মারো, আর দৌড়োও সামনের দিকে। ঠান্ডা জমাটি। লেট অক্টোবর মুভমেন্ট, বরফ পড়েনি, সময় এসে গেছে, এ ঠান্ডা তারই সংকেত। হাড়-মাস যেন টরেটক্কা বাজাচ্ছে। ‘..নাস্তা বালুনি পে’..

রূপ সিং এর ডেরার থেকে ১৫ কদম খনখনিয়ার দিকে এগিয়ে, ৯০ ডিগ্রি লেফট টার্ন , তারপর মাইক টাইসনের একটা আপার কাট, মানে সোজা ৩০ মিটারের একটা খড়ি চড়াই । হেডল্যাম্প অন , চলা চালু, ঘড়িতে ডট ৫টা । পা রাখা যাচ্ছে না, জমাটি ফ্রস্ট । চুরমুর বানানোর সময় ফুচকাগুলো ভাঙার আওয়াজ যেমন হয় , ঠিক তেমন আওয়াজ হচ্ছে জুতোর তলায়, বাঁ পা জমে তো ডান পা স্লিপ করে, দম বেরিয়ে যাচ্ছে । এই ৩০ মিটার মারতে পারলেই গুরাসের জঙ্গল শুরু, ডাল ধরে ধরে পেরিয়ে যাওয়া যাবে । জমাটি আঁধার তারসাথে দোসর ঘন কুয়াশা । থম ধরা পরিবেশ । জুতোর আওয়াজ ছাড়া, শুধু আমাদের শ্বাস ফেলার ফোঁসফোঁসানি । পশ্চিমের ঢালান, তাই সূর্যের আলো দেরী পড়বে, ততোক্ষন ফ্রস্টের বেয়াদপি মেনে নিতে হবে । গুরাসের জঙ্গল যত ঘন হচ্ছে অন্ধকার তত জমাট হচ্ছে, মুখে কথা নেই, নেহাত একটাই রাস্তা তাও আবার আগে পাক মেরে যাওয়া, তাই চলতে ভয় হচ্ছে না । নইলে কবে ব্যাক গিয়ার মারতাম । গুরাসের জঙ্গলের হাইট কমছে, স্যাক আটকে যাচ্ছে, তাতেই বুঝতে পারছি । তারমানে ,সামনেই সেই ছোট্ট ময়দানটা । পিক আপ বাড়ানো যাচ্ছে না , কামারশালার হাপরের মত আওয়াজ বেরোচ্ছে । … ‘দাদাই..’ শুনেছি, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, ‘চলো রে ডোলী উঠাউঁ কাঁহা, পিয়া মিলন কে রুত আয়ি..’ তার মানে ময়দান সামনে, শরীর তাতানোর মত রোদ্দুরও ভরপুর, না হলে এ গান গাওয়ার পাত্তর বাবা নয় ।

গলার ভেতরে, আলটাগরার কাছটায়, কেমন যেন থকথকে মত কিছু আটকে আছে, কথা বেরোচ্ছেনা, জিব খটখটে শুকনো, স্যাক ফেলে দিয়েছি । ভাই জলের বোতলটা পুরো সোজা করে ঘাড় বেঁকিয়ে জল খাওয়ার চেষ্টা করছে । পুরো রাজা ট্যান্টেলাসের গল্প, জল কৈ ? বোতল জমে বরফ । টিন প্যাকড রসগোল্লার এক পিস করে হাতে ধরিয়ে বাবা বললো, ‘সুপ মারা যাক..’

উবু হয়ে পিঠে রোদ্দুরের তাত নিচ্ছি, ঠান্ডাটা হাড়ের ভেতর থেকে কিছুতেই বাইরে বেরোচ্ছে না । যম ঠান্ডা । ‘..দাদাইইইই…. শুউউট..’

উফফফফ… কোন শব্দ দিয়ে লিখবো ? একটা শব্দও আমার ভাঁড়েরে নেই, আর শব্দ দিয়ে কি সব অনুভূতি প্রকাশ করা যায় নাকি ? তাহলে তো নৈঃশব্দ বলে কিছুই থাকতো না পৃথিবীতে, পারছি না অনুভূতি চেপে রাখতে..

সোজা দাঁড়িয়ে পড়েছি, নাক বরাবর লম্ব টানলে, আমার দু পায়ের মাঝ দিয়ে লম্ব রেখাটা যেখানে মিশবে,তার ঠিক নিচেই কাঁঠালিয়া । এখান থেকে আনুমানিক ২,৭০০ ফুট নিচে, লম্ব রেখার থেকে আমার  ঠিক বাঁ দিকে, ৩০ ডিগ্রি কোণে পাঁওয়ালী দূয়ার, কোমর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে , কাকের এক উড়ান দূরত্ব, ঝকঝক করছে, ক্যামেরা জুম করার দরকার নেই । ওর এ্যাকচুয়াল লেফট সোল্ডার বরাবর, সামিটের একটু নিচে কাটা গুফাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, লম্ব রেখার থেকে আমার ঠিক ডানদিকে, ১০ ডিগ্রি কোণে বালজোরী, আর এ দুটোর মাঝ বরাবর উঁকি দিচ্ছে নন্দাখাত আর তার বাঁ দিক ঘেঁষে নন্দা দেবী মিডল। বালজোরীর ঠিক ২০ ডিগ্রি কোণে , আমার ডানদিকে পাঁচুলী । বালজোরী কল পর্যন্ত পরিষ্কার… জয় নন্দা মাইয়া । সেরাই ক্যাম্প থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু কষ্ট, সব কড়ায়গন্ডায় উসুল। এর আগে এতবার দেখেছি কিন্তু প্রতিবারই নতুন নতুন রূপে চোখের সামনে উদ্ভাষিত হয় । হাঁ করে দাঁড়িয়েই আছি, পলক ফেলতেও মন চাইছে না….

‘বারবার দেখো, হাজার বার দেখো, ইয়ে দেখনে কি চিজ হ্যায় হমারা দিলরুবা..’ .. সিচুয়েশনের সাথে খাপে খাপে মিলে যাওয়া পারফেক্ট গান,গলা মিলিয়ে দিলাম … খচাত-খচাত করে ক্যামেরার শাটার টিপেই চলেছি, হুঁস নেই,সব উড়ে গ্যাছে মাথা থেকে, শুধু আমি আর সামনে হিমবন্ত হিমালয়…

‘দাদাই..’

‘হুমম..’

‘শুনলি তো ?’

‘কি ?’

‘দে দোল দোল দোল, তোল পাল তোল, চল ভাসি সব কিছু ত্যাগইয়া…’

বাবা সামনের গলতার দিকে চলতে শুরু করেছে, আর কিছু পরেই বাবা ফেড আউট হয়ে যাবে…

‘স্যাক ওঠা জলদি, মুভ..’

এখান থেকে গুনে গুনে ১৯ টা বেন্ড, ব্যাস, বালুনি টপ ! গুনতি চালু ! ট্রি লাইন খতম । দাঁড়ানোর সিন নেই । লম্বা টান মারতে হবে, নইলে প্ল্যানটাই ভুন্ডুল ।

‘দাদাই..ওই দেখ..’

‘হুমম..কি?’ 

বাবার সাথে আমাদের দূরত্ব ঠিক ১০০ কদম, ধপাস করে স্যাকটা ফেলে দিলাম..

‘পৌঁছ গয়ে বালুনি ?’ বাবা হাসছে । ঘড়িতে পাক্কা ৮:৪৫ । আগের বার মেপে ছিলাম,কাঁঠালিয়া থেকে পাক্কা সাড়ে তিন কিলোমিটার , হাইট ৪০০০ ফুট । কিলোমিটার প্রতি প্রায় ১০০০ ফুটের চড়াই । দম বার করে দেয় । সুখরাম নালা থেকে উঠে আসা ঢালান বরাবর দূর্গা দাদারা উঠে আসছে, খাড়া চড়াই টানছে, দু হাত বিচিত্র ভাবে নাড়িয়ে সিগনালিং কোডে কথা চলছে, এখনো এটা শিখতে পারলাম না । ‘..মৌসম পুরা ক্লিয়র, খিঁচো খিঁচো, যিতনা মর্জি ফোটো খিঁচো, ব্যস ওর তো কাম হ্যায় নেহি…’ ভাই সাটার টিপে চলেছে.. ‘..এ আকাশ, তুমি চায়  পিবো ?’ আমার চোখ সোজা মৃগথুনির দিকে । আমার ডান হাতে মাইকতোলী , বাঁ হাতে বালুনি পিক । বালুনি পিকের ঠিক ডান দিক ঘেঁসে রাস্তা চলে গেছে দেবী কুন্ডের দিকে ।     বালুনি পিকের পাশে, যেখানে গিয়ে দেবী কুন্ডের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা হঠাত হারিয়ে গেছে, তার ঠিক ডানদিকে, ৩০ ডিগ্রি কোণে আরো সব সুন্দরীরা .. নাগ পিক, আননেইমন্ড পিক, ভানুটি, টেন্ট পিক, দেবীকোট, থারকোট, মৃগথুনি..

ঝকঝকে ওয়েদার, কনকনে হাওয়া বইছে। আমার চোখ অজান্তেই এদের একটির দিকে স্থির হয়ে যাচ্ছে একটু পরপরই…..

‘লিডর সাব, ঝান্ডা গাঁড় দে ?’  

‘নেহি..’

‘তো ক্যায়া ? থোড়া উপর ইয়া থোড়া নিচে গাঁড় দুঁ ?’

‘নেহি..’

‘মানে ? কোথায় হবে ক্যাম্প ?’

এই সিচুয়েশনটার জন্যে তৈরী করছি নিজেদের সেই জানুয়ারী থেকে, ভাই পাশে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে । আর পিছু হটার জায়গা নেই আমাদের । স্ট্রেইট ব্যাটে খেলবো, যা হবে তা হবে । দান ছাড়বো না । চার দিকে গোল করে ঘেরাও হয়ে গেছি । আমার ঠিক সামনে দূর্গা দাদা, মৃগথুনির দিকে  পেছন করে, বাঁ দিকে তিরছি কোনে বাবা, বাবার উলটো দিকে চন্দু, পিঠটা মাইকতোলীর দিকে, ভাইয়ের পেছনে তারা দাদা । পিন পড়লে আওয়াজ পাবো । ভাই সোজা বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললো ‘ ডেসটিনেশন থুনি ভায়া সুখরাম…’  

চোয়াল শক্ত, দাঁতে দাঁত ঘষার আওয়াজ পাচ্ছি…

 ‘এটা তোমাদের আন কমন রূট ?’

‘হুম..’

‘তারপর ?’

‘..সেটা থুনির পর ঠিক হবে..’

‘মতলব ? থুনি কে বাদ ভি কুছ হ্যায় ?’

‘ও বাদ মে ঠিক হোগা, আভি থুনি ভায়া সুখরাম…’

ভাই সমান তালে খেলছে , আমি বাউন্সারের ভয়ে সিটিয়ে যাচ্ছি, চোখ আটকে যাচ্ছে যেখানে তাকাতে চাই না ঠিক সেখানে । সবার মুখ কেমন কালচে মেরে গেলো । সময় কাটতে চাইছে না । ভাই ঘড়িটা দেখলো বার কয়েক ।

‘রং রূট !’

‘তারা ! চায় লগা দে !’

‘রূট কা হাল পাতা হ্যায় কিসি কো ? লাস্ট রূট কা চাল ?’

ভাই খামচে ধরেছে, বেশ লাগছে । অনেকগুলো গলার আওয়াজ কেমন মিলেমিশে একটা বিচিত্র আওয়াজ কানে ভনভন করছে । 

‘তিনদিন কা রেশন ছোড় দে নাতি ..’

‘সুখরাম নালা হোকে চলে আঙ্কেল ?’

তারা দাদা আর চন্দু বেরিয়ে গেলো সুখরাম নালা বরাবর ।ঘড়িতে পাক্কা সাড়ে ন টা । ক্যাম্প তল্লা সুখরাম । মাথাটা ভনভন করছে । হাতে আঁকা স্কেচ ম্যাপ, স্লাইড, ডায়েরী সব মুখস্ত । ম্যাপটার জেরক্সও স্যাকের ভেতরে । কিন্তু এ নামটা কোথাও পাই নি , যাক গে…

কেমন যেন লাগছে । ঘোর কাটছে না। আমাদের প্ল্যান মাফিক সব হচ্ছে, তার কারনে ঘোর কাটছে না , এমনটা নয় । যেমনটা হয়, যেমন হওয়ার কথা, তেমনটাই হচ্ছে । ১২:৩০ এর মধ্যে ক্যামপ রেডী । ক্যাম্প সাইট ক্লিনিং , পুজো দেওয়া , কিচেন রেডী করা , টেন্ট পিচ সব যেমন হওয়ার কথা , তেমনই হয়েছে । একটু রি-ওয়ান্ড করে নেওয়া যাক…

বালুনি থেকে সুখরামের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছিলো । অনেকটা সান্দাকফু থেকে ফালুটের পথের মত । আপাত সমতল রাস্তা । মৃগথুনির দিকে মুখ করে রওনা দেওয়া হল । ১০০ কদম এগোনোর পরেই রাস্তাটা বাঁ দেকে মুখ ঘোরালো । আবার গধেড়া , অনেকটা জায়গা জুড়ে ফেটেছে ।  

এ পাশটায় রোদ তেমন নেই প্রায় । পা দিয়ে বোঝা গেলো এখানে ফ্রস্ট রয়েছে এখনো । কিলোমিটার দেড়েক চলেছি কি চলিনি, রাস্তা নিজের রূপ খুললো । হয় গধেড়া নেগোশিয়েট করো, নয় ফিরে যাও । গধেড়াগুলোও এক একটা দানব যেন, হাঁ করে গিলে খাবে । সোজা ৮০ ডিগ্রি গ্র্যাডিয়েন্ট এ সুখরাম নালায় চোবানী খাওয়ানোর মতলবে ঘাপটি মেরে বসে আছে। গধেড়া নেগোশিয়েট করা যাবে না কিছুতেই, লুস বোল্ডারের দারুন প্রেমালিঙ্গনে সোজা সুখরাম নালায় যেতে হবে তাহলে । সুতরাং গধেড়ার ওপরের রাস্তাই সেফ । প্রতিবার মনে হচ্ছে পায়ের তলায় কাদা মাটির টানে নিচে চলে যাচ্ছি  । মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে পুরোনো কিছু কথা , যা কোথাও একটা পড়েছি…. অমূল্য সেন এর নেতৃত্বে , পিন্ডার গঙ্গা উপত্যকা অভিযান সেরে ফেরার পথে , গিলা পাহাড়ের খপ্পরে পড়ে চিরতরে হারিয়ে যান অনিমাদি (এই অংশটাই আমার মনে পড়লো, তাই হুবহু লিখলাম) …. এগুলো এক একটা সেই গিলা পাহাড় নয়তো ? কমন কোনো কিছুই আর হচ্ছে না । না হুইসেল, না গান, না সিটি… কোনো কথা নেই কারো মুখে..

রাস্তাটা (!) বাঁ দিকে ঘুরেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলো । পায়ের তলায় মাটিটা অনেক স্টেবল ঠেকছে । একটু ডানদিক মুড়ে তাকালে, সুখরাম গুফা দেখা যাচ্ছে । তার ঠিক নিচেই একটা ছোট্ট ঘাস ময়দান । তাহলে ওটাই কি তল্লা সুখরাম ?

মনে হল কেউ কিছু বলছে ! একটা জোর ঝাঁকুনি .. ‘ এখান থেকে এক সেন্টিমিটারও আগে পিছে নড়বে না, ভাইকে সাপোর্টে রাখো…’ মাটির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাস্তাটা আচমকা যেন একটা গর্তে হারিয়ে গেলো । হট করে মনে হলো সব কিছু যেন ছন্দে ফিরছে… ‘লিডার সাব বিলে পকড়ো , সামনে চিমনি, বরফ সে খতরনাক হো গয়া হ্যায়..’

চিমনি ?  উফ শুশুনিয়া বা মাঠায় পৌঁছে গেছি ।

‘কাঁহা চিমনি ? হম লিড করেঙ্গে ..’

‘চুপচাপ বিলে । করো এ্যরেস্টিং এ যেন ভুল না হয়..’  

আবার সেই লোড ট্রানফার………..

যেন ছন্দে ফিরছে সব কিছু , মনটা ফুরফুর করছে…

তারপর হুঁস হারানোর মত কিছু ছিলো না, দু চারটে সামারসল্ট ভল্ট ছাড়া । তারা দাদা, চন্দু-র মুভমেন্ট দেখতে পাচ্ছি । অনেক নিচে, সুখরাম নালা বরাবর । চোখের সমান্তরালে, নালার ওপারে, সেই ছোট্ট ঘাস জমি ।

‘আঙে্কেল, সিধা খিঁসকে ? আগে ওর কোই রাস্তা নেহি.. ’

‘বাঁয়ে কাট .. সিধা চলেগা তো সুখরাম পে বহ যায়গা, পার হোনা মুসকিল, বাঁয়ে কাট, আগে এক রক ব্রিজ থা , ওঁহিসে পার করেঙ্গে ..’

‘বাঁয়ে কা গধেড়া খতরনাক ..’

‘অব বোল্ডার খিসকে গা নেহি, জম গয়া, বাঁয়ে কাট..’

অতএব  গধেড়া , রক ব্রিজ তারপর ছোট্ট ঘাস জমি এবং তল্লা সুখরাম । কাপ্তানির ব্যাটন বাবার হাতে । তারপর ক্যাম্প সাইট ক্লিনিং, পুজো চড়ানো, কিচেন রেডী করা , ক্যাম্প এস্টাব্লিস্ট .. সব সেই কমন । শুধু বেলা ১২:৩০ এ ঘন কোহড়া । তিন বুড়ো গোমড়ামুখো । শুধু একবার বলেছিলাম ‘সুখরামটা দেখে আসলে হোতো না ?’ তিনজনে একসাথে খেঁকিয়ে উঠেছিল : ‘নো! ‘….নেহি !’

২০০৫ সালে দূর্গাপুর মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের অভিযাত্রীরা সুখরামে ক্যাম্প করেছিলেন । কোন অভিযান ছিলো তা আমার জানা নেই । সুখরাম কেভ এ তখন একসাথে ১০-১২ টা টেন্ট পড়ার পরেও জায়গা থাকতো । সন্ধ্যে থেকে বৃষ্টি, ক্যাম্পাররা স্বাভাবিক নিয়মে এ বৃষ্টিকে মেনে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ী জমান । কিছু পোর্টারের ঠান্ডা বেশী লাগায়, তারা তাদের টেন্ট, কেভ এর ভেতরের দিকের ওয়াল ঘেঁসে রি-পিচ করেন । রাত ৯ টা নাগাদ বিকট আওয়াজে কেভ এর ভেতরের দিকে থাকা ক্যাম্পাররা আতঙ্কে বেরিয়ে আসেন টেন্ট ছেড়ে । ততক্ষনে যা ঘটার ঘটে গেছে । কেভ এর বাইরের দিকে যে ওডিয়ার ফর্মের রুফ-রক ছিলো সেটা ভেঙ্গে তার নিচে যত টেন্ট ছিলো সব কটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে । ভয়ঙ্কর আতঙ্কে, জীবিত অভিযাত্রীরী ওই দূর্যোগ মাথায় করে, রাতের আঁধারে রওনা দেন জাতোলীতে । তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন সহযাত্রীদের উদ্ধারের কিন্তু ওই বিরাট বিরাট বোল্ডার তাদের চেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে । সুখরামে চিরতরে রয়ে যান হিমালয়প্রেমী কিছু দূর্মদ অভিযাত্রী । সেদিনের বেঁচে যাওয়া গুটি কয়েক প্রাণ এর মধ্যে দূর্গা দাদা, তারা দাদা দুজন । এ তথ্য তাঁদের থেকে অতি কষ্টে জেনেছি । সে রাতের আতঙ্ক আজো তাদের চোখে মুখে । যে ম্যাপ মুখস্ত করে এ প্ল্যান সেটা অনুযায়ী সুখরাম কেভ খুব কাছেই হওয়া উচিত । কাল দেখা যাবে ওটা কোথায় । তল্লা সুখরাম কোহড়ায় ঢাকা, ভিসিবিলিটি জিরো, তাছাড়া জায়গাটা একটা খাঁজের মধ্যে । ক্যাম্পের সামনে, নিচের দিকে, সুখরাম নালার গর্জন, উলটো দিকে নেমে আসার সেই খতরনাক গধেড়ার পথ,  ডান দিকে পাহাড়টার পেছনেই নাকি সুখরাম নালার জন্মস্থল । বাঁ দিকে সুখরাম নালার গর্জ বরাবর চোখ চালালে কাঁঠালিয়া । সোজাসুজি চোখ রাখলে বালুনি দেখা যাবে । কিন্তু এখন তা সম্ভব না । ম্যাপটা রি-সেট করার জন্য ডেটাগুলো দরকারী । জাতোলীতে মানুষের কলতান , বসতির বহু আগে (সেটা ঠিক কবে কেউ বলতে পারেনি জাতোলীতে) এক সন্ত মহারাজ একাকী এই গুফায় সাধনা করতেন, তখন এ জায়গা অতীব দূর্গম ।  এক আন্ডওয়ালের নজরে আসে বিষয়টা ।  সে সেটা বাকীদের জানায় । লোকের আনাগোনা শুরু হয় । সাধু মহারাজ গুফা ছেড়ে নিরুদ্দেশে পাড়ী জমান । আর কোনোদিন কেউ তাকে দেখেনি । তাঁর শুকনো চেহারা আর অতীব প্রশান্তিযুক্ত মুখ তাঁকে ‘সুখরাম বাবা’ নামে পরিচিত করে (এর সত্যাসত্যও আমার জানা নেই) । সেই থেকে নাকি জায়গাটা সুখরাম নামে পরিচিত !

নাহঃ ! কাল সকালের মুভমেন্টের হিসেবটা কষে ফেলতে হবে । আপাততঃ, ডেসটিনেশন থুনি বুগিয়াল…

তল্লা সুখরামে সুখ নেই ! অসুখে ভরা ! কাঁঠালিয়ার দিক থেকে সোঁ সোঁ করে হাওয়া উঠে এসে ক্যাম্পের বাঁ দিকে সুখরাম নালার শেষ গার্ড ওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মোচড় মেরে ঘুরপাক খাচ্ছে । কোহড়ায় ঢাকা অন্ধকার । টেন্টের বাইরে বেরোতে মন চাইছে না । ছবি তোলার জো নেই । তিন বুড়োর মুখ হাঁড়ি । গোটা ক্যাম্প সাইটটাই গা ছমছমে । সোলার ল্যাম্প জ্বালিয়ে ডায়েরীর পাতা শেষ করা ছাড়া কাজ নেই । দুপুর তিনটেতেই মনে হচ্ছে , কোনো অমাবস্যার গভীর রাতে টেন্টে বসে আছি । যেদিন থেকে কলম ধরতে শিখেছি, সেদিন থেকে প্রতি ট্রেকের জন্য নতুন নতুন ডায়েরী আর পেন গিফট পাওয়াটা নর্মাল ব্যাপার । সব লিখতে হবে , নাম্বার ১  নাম্বার ২ , ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড-আনা-পাই-সিকি-কড়া-গন্ডা সঅঅঅব….. ট্রেক শেষে, বাড়ী ফেরার ৭ দিন পর ডায়েরী খুলে পড়া হবে , শেষে একটা ক্যাডবেরীবার আর হাততালি  (এখন বড় হয়ে যাওয়ায় সেটা থেকে বঞ্চিত) । ভুল বলে কিছু নেই সেই ডায়েরীতে । সব ঠিক ।  তবে একটা শর্ত, কাটাকুটি চলবে না আর নো এডিট । আগে, বছরে তিনটে ট্রেক এখন দুটো । বড়ো হওয়ার প্রবলেম প্রচুর । কাঁচা হাতে লেখা সেই ডায়েরীর পাতা আজো ওলটালে রোমাঞ্চ হয় । বড় হওয়াতে কিছু এ্যাভান্টজ বেড়েছে .. বছরে একটা এক্সপিডিশন আর একটা ছোট ট্রেক, এটাই বড় হওয়ার প্রাপ্তি । আরো প্রাপ্তি আলাদা টেন্ট এ্যাকোমডেশন। সন্ধে ৬ টায় তিনটে পরপর  জবরদস্ত সিটি তল্লা সুখরামের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিলো । আমরা দুভাই, দুজন দুজনকে চিয়ার আপ করেছি সিটি শুনে । ওই সিটি বুঝিয়ে দিচ্ছে , মুষড়ে পড়া তিন বুড়ো ,  গোঁফে তা মারছে । শিকারের গন্ধ নাকে লেগেছে তিন বুড়ো শার্দুলের । টিম আবার ছন্দে ফিরবে,  হিমালয় খুলে দেবে রূপের খাজানা, আমরা ভরে নেবো আমাদের ঝোলা..ওই সিটি তারই ইঙ্গিত ।

‘কি রে ? চল । ডিনারের তিনটে সিটি পড়ে গ্যাছে অনেকক্ষন..’

‘আও লিডার সাব, আও । ডেপুটি লিডর আপ ভি আ যাও । স্বাগত হ্যায় আপ সব কো তল্লা ক্যাম্প কিচেন পে..’

‘জমকে মারো খানা , কাল টনাটন ভাগনা হ্যায় সিধা থুনি তক, বিচ মে কুছ নেহি মিলেগা..’ গোবী পড়াঠা, টমাটো পোড়া চাটনি , টমাটো সুপ সাথে তিন বুড়োর , বরফে পোড়া কালো মুখের দন্ত বিকশিত হাসি..

শুধু ছোট একটা ক্যাপ বন্দুকের ফায়ার হয়েছিলো….

‘বাফার ডে কটা ?’  

‘দুটো ..’

‘মাত্র দুটো ? ব্যাড টিম ম্যানেজমেন্ট, স্যাড আইটেরনারী! ষোল সতেরতে মাত্র দুটো বাফার ডে ?’ (মানে, ষোল হাজার সতের হাজার)

সত্যিইতো ! বাড়ী থেকে সিধে বাগেশ্বর, বাগেশ্বর থেকে খারকিয়া হয়ে সিধে জাতোলী, জাতোলী থেকে সেরাই, সেরাই থেকে কাঁঠালিয়া, কাঁঠালিয়া থেকে তল্লা সুখরাম.. গত ছয়দিনে মাত্র ২০ ফুট থেকে সিধে প্রায় ১৪০০০ ফুটে চলে এসেছি বিনা একটাও এক্সট্রা রেস্ট ? (কলকাতা মোটামুটি ২০ ফুট msl , তল্লা সুখরাম মোটামুটি ১৪০০০ ফুট msl)…তল্লা সুখরামে প্রাণ ফিরছে….. জয় হো বুগিয়াল দেবতা কি…. কাল সকালে মুভ ! সুতরাং মানে মানে করে শ্লিপিং ব্যাগের গর্তে সেঁধনোই বুদ্ধিমানের কাজ । নো পাঙ্গাবাজী…

দিন : সপ্তম, ঘড়িতে সকাল ৪:২০,  তিনটে কড়া পাঁকের হুইসেল , দুটো মাঝারী পাঁকের থ্রেট.. ‘গুউউউউউড মরররনিং, গররররম  চায়য়য়য়….’ একে শ্লিপিং ব্যাগ তায় শেষ রাতের ঠান্ডা, কুকুরকুন্ডলী হয়ে আরামের ঘুমের মজা নেওয়ার চান্সই নেই, তার ওপরে সকাল সকাল ফুরুর ফু…

সুখরাম নালার ঢালানকে ঠিক পেছন করে, কাঁঠালিয়ার গর্জকে ডান হাতে রেখে, সিধে ওপর পানে চলো ! ঘাড় ঘোরানো , আকাশ দেখা , এসব বাদের খাতায়… তারা দাদা আর চন্দু ক্যাম্প গোটাচ্ছে , একটা সময় ওদের বিন্দুর মত দেখাবে. তারপর ওরা হারিয়ে যাবে দৃষ্টির আড়ালে । বড়ো জোর ঘন্টা আধেক বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ,ওরা হনহনিয়ে উঠে আসবে ভেজা টেন্ট প্যাক করে । তারপর অনাবিল হাসি আর গপ্পের ফুলঝুরি । মোটামুটি কমন ব্যাপারটা ফিরে আসছে । পায়েও জোস ফিরছে । নো গধেড়া নো সামার সল্ট ভল্ট .. মৌজা মা ছ..

ধীরে চলছে টিম, খুব ধীরে । বুগিয়ালের ঘাস বাড়ছে,আকাশ হেসে উঠছে, জ্যাকেট রোদের হালকা তাত নিতে শুরু করেছে , এ ওকে সাপোর্ট দিচ্ছে, রাস্তা থামছেনা , তারা দাদা , চন্দুও লাইন আপ হয়েছে.. কমন ব্যাপারটা ফিরছে …

‘ডাহিনে কাট ..’

কড়া পাঁকের কমান্ড , বেশ কড়া ঝাঁঝের । কিন্তু ডাইনে রাস্তা কোথায় ? সোজা উঠে যাওয়া বুগিয়ালের ঘাস জমি বড়োজোর ৭০ মিটার, তারপর সেটা বাঁ হাতে হারিয়ে গেছে খাড়া রক জোনে । স্ট্রেট নেমে গেছে ন্যাড়া রকটা । মুভমেন্ট স্টপ । ওরা লোড নামিয়ে ফেলেছে । দাঁড়িয়ে আছে ঘাড় নিচু করে। সামনের লোকটা একবারও পেছন না ফিরে উঠেই যাচ্ছে । হঠাত সিক্সথ সেন্স বললো সামথিং গোয়িং রং… টানা তিনটে লম্বা হুইসেল, লোকটা থামলো , পেছন মুড়লো..

‘আ যা দূর্গা , আ রে তারা, আজ দিন আয়া হ্যায় আপনে আপ সে মাফি মাংগনে কা , ইসে বরবাদ মত কর বেটা.. আ যা..’

‘ফেঁক দে লোড , আ যা..’

আমার বোঝার বাইরে কিছু একটা ঘটছে । বুঝতে পারছি না । কিন্তু লোকটার কথায় কেমন যেন আর্তি মেশানো আছে । ভাবাভাবি পরে ,লোডটায় ঝটকা মেরে সোজা ওপরপানে, ভাই পিছে, ও শুধু একবার বোললো  ‘হো ক্যায়া রাহা হ্যায়?’ আমি চোখ মারলাম । ওরা তখনো দাঁড়িয়ে । সামনের দিকে লোকটা মুভ শুরু করে দিয়েছে । বড়জোর আমার থেকে ২০ মিটার আগে । চড়াইটার দম বোঝা যাচ্ছে ।  দমদার চড়াই । লোকটা থামছে না । এবার বাঁয়ে ঘুরবে। ‘রুকো মত ।  চলো..’ … দূর্গা দাদা, গলাটায় ভেজা স্বর ।  তিনজনেই আমাদের ঠিক পাশে । লোকটা  দাঁড়িয়েছে ।

‘আগরবাত্তি নিকাল তারা..’

ধুপকাঠি ? যাকে কোনদিন প্রনাম করতে দেখলাম না, যে কোনদিন কোন পূজার আশপাশের ছায়াও মাড়ালো না , যে আমাদের সারা জীবন শেখালো ‘ইয়ে শর ঝুকনে কা নেহি কাটনে কা হ্যায়’ সে ধুপকাঠি চাইছে ? হলোটা কি ? ভাইয়ের ডে প্যাকের থেকে প্যাকেট বের করে দূর্গা দাদা ধুপকাঠি দিলো । বাবা চড়াইয়ের টং থেকে নিমেষে হারিয়ে গেলো । চড়াইয়ের টং এ চড়ে দেখলাম বাবা অনেকটা নিচে, কতগুলো বোল্ডারে পরম যত্নে হাত বোলাচ্ছে , নিচে নাবতে যাবো ,তারা দাদা দূর্গা দাদা দু পাশ থেকে টেনে ধরলো । বাবা আমাদের দিকে পেছন করা , কি হচ্ছে কিছুই বুঝতেই পারছি না । কেউ কথা বলছে না । সবার চোখ বাবার দিকে । পিন পড়লে সে আওয়াজও এ্যাভালাঞ্চের মত শোনাবে এতোটাই নৈঃশব্দ । বাবা বাঁ দিকের ওয়ালের দিকে মুভ করছে, হাঁটু গেঁড়ে বসে ধুপকাঠি জ্বালালো, ঠিক আরতি করার মত হাত নাড়ছে ধুপকাঠি সহ । রহস্য কাটছে না । এটা কি কোনো বিশেষ দৈবস্থল ? বাবার জানা  কোনো শক্তিশালী শক্তির আস্তানা ?  বাবা ঘাটে-আঘাটে ঘোরা লোক । পুরো একটা সত্যির মাত্র ৫% আমাদের বলবে আর বাকীটা জানতে চাইলে বলবে নিজেরা জেনে নাও । এটা কি সে রকম কোনো গোপন জায়গা ? বাবা উঠে আসছে । টং টার মাথায় আসার পর জানতে চাইবো ব্যাপারটা কি ? এটা ব্যাপারটা তো কমন নয় ? বাবার চোখের ফোটো গ্রে চশমার পেছনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি জল ..

‘বাবা ?’

‘কুছ নেহি বেটা , উমর বড় গ্যায়া হ্যায়, আঁখ ধোঁকা দেতা হ্যয় আজকল, টিম আগে বড়াও বেটা, বহত দূর কা সফর হ্যয়..’

পায়ের তলায় যেন ভূমিকম্প হচ্ছে , দুটো পা পাথরের মত ভারী, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে , তাহলে কি এটাই .. ‘হাঁ , এহি সুখরাম গুফা..’

বাবা ঢালান ধরে চলে গেছে । ছায়া পর্যন্ত চোখের আড়ালে …

ধুস! এসব শ্মশান, কবরস্থান, আমার একেবারেই পোষায় না । মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। আর ,বাবার আবার ওসবই  ভালো লাগার জায়গা যেন । ঠিক হজম হচ্ছে না সকালের সুখরামের ঘটনাটা । পা চলতে চাইছেনা, শরীরটা কেমন হালকা হয়ে গেছে । কেমন একটা লাগছে ।

‘ক্যায়া হুয়া লিডর সাব ? গুমসুম কিঁউ ? মৌজ করো ,মৌসম সুহানা হ্যায়, মজা লে লো’  মজা ? সুখরাম সব মজা কেড়ে নিয়েছে ।

‘আরে চন্দু দাদা, ও লিডার বন গ্যয়া, ইস লিয়ে ভাও লে রহা হ্যয়’

চন্দু হল চন্দ্রপল, আমারই বয়েসী ,আর্টস নিয়ে গ্রাজুয়েশন করছে ,আমার খুব ভালো সাথী আর ভাইয়ের খুনসুটি করার একমাত্র জায়গা । দূর্গা আর তারা দাদা মাত্র ১০ মিটার আগে । বুগিয়ালের ঘাস ক্রমশ হাঁটু পর্যন্ত উঠে আসছে । না ডাইনে, না বাঁয়ে, কিছুই দেখার যো নেই। খাড়া উঠছে রাস্তা । তবে গধেড়া বা সামারসল্ট ভল্টের ঝামেলা নেই, লোড ট্রান্সফারের গল্প নেই, এটাই বাঁচোয়া । সেভাবে ভাবলে স্টেট হাইওয়ে । না খাদের ভয় ,না বোল্ডারের হুমকি, বুগিয়ালের ঘাসের কার্পেট বেছানো রাজ্য সড়ক পার করছি মনে হচ্ছে । ‘পাপা শায়েদ বহত আগে নিকল গয়ে..’ কথাটা ওদের দু ভায়েরই কানে গেছে.. ‘কাঁহা আগে ? দো বেন্ড মারো, ফির দেখো উপর মজে সে টন সো রহে হ্যঁয়..’ বাবাও পারে বটে, টিম একটু পিছে থাকলেই ম্যাট্রেস খুলে দে ঘুম । এটাকে নাকি ঘুমের ক্র্যাস কোর্স বলে । চড়াইটার একটা ভালো দিক আছে, শুধু আকাশ দেখতে পাচ্ছি । ঘন নীল , সেটা কত ঘন নীল তা বোঝানো মুসকিল। বাবা সাথে থাকলে নিঘ্ঘাত বাণী শুনতাম ‘..ভূমা নয়, ভুমিতে নজর রাখো..’ । চড়াইটার টং টা যে কোথায় সেটাই নজরে আসছে না । উঠিয়েই যাচ্ছে ওপর দিকে । বোর লাগছে । না পিক দেখতে পাচ্ছি , না কোন গর্জ । ‘..ক্যায়া বোলা থা ? সহি নিকলা না ?’ টানটান হয়ে বাবা ঘুম মারছে । ‘ইয়ে আপার সুখরাম হ্যয় ক্যয়া ?’ ‘হাঁ..পে হলে ডিজেল কা যোগাড়া কর লেতে হ্যঁয় , নেহিতো গাড়ী আগে ভাগেগা নেহি , দেখা না সোগয়া গাড়ী, উসকে বাদ অন্ডা ম্যাগী মারকে সিধে ভাগেঙ্গে , কিঁউ রে আকাশ ?’

উন্মুক্ত ময়দান যেন । চড়াইয়ের দাপাদাপি নেই , নেই বুগিয়ালের ঘাসের প্যাঁয়-পয়জার । মস্ত জায়গা । আরাম করে ঘুম মারার আইডিয়াল ঠিকানা । ডানদিকে, মাইকতোলীর এ্যাকচুয়াল রাইট সোল্ডারে এই সকালের মেঘের ভেলা , ডান দিকটা ভিজিবল নয় । ওপরদিকে বুগিয়ালের ঘাসগুলো সোনার বরন । ক্যামেরা চালাতেও ইচ্ছে করছে না । দুটো টুকরো কালো মেঘের অদ্ভুত ফরমেশন হয়েছে , যেন মাসকারা দেওয়া চোখ ।

‘ওগো কাজল নয়না হরিণী, তুমি দাও না ও দুটি আঁখি, ওগো গোলাপ পাঁপড়ি মেলো না , তার আধারে তোমাকে রাখি..’ এখানে কোথায়ই বা গোলাপ ? আর কোথায়ই বা দুটো চোখ ? বাবার মাথার ক্যাড়া কিলবিল করলে এমন সব শোনা যায় । শুনতে শুনতে কানে পোকা ধরে গেছে ।

  ‘ডিজেল ভরো, গাড়ী ভাগাও । বেলা ৯ টা বেজে গেছে খেয়াল রেখো..’

‘যো হুকুম মেরে আকা..’  ডিজেল পেলে গাড়ী আর খিচিরমিচির করবে না অনেকক্ষন .. এরপর  ন্যাশানাল হাইওয়ে , চওড়া রাস্তা ,বুগিয়ালের ঘাস অনেকটা দুরেদুরে আমাদের সাথে চলছে , ঝকঝকে রোদ, ঘন নীল আকাশ , আর মাঝে মাঝে কিছু পেঁজা তুলোর মত মেঘ আমাদের ফলো করছে…. সুহানা সফর …

চড়াইটা ততটা বোরিং লাগছে না । ডানদিকে বাড় গ্লেশিয়ারের মোরেনজোন দেখা যাচ্ছে, মেঘের ফাঁক দিয়ে পিক ও লুকোচুরি খেলছে, অতএব  চলাটা মস্তির চলা হচ্ছে । মুভমেন্ট একসাথেই হচ্ছে , বড়ো জোর ৭-৮ মিটার আগে পিছে । হঠাত মনে হল, দুটো পা যেন পেছন দিকে চলে যাচ্ছে , বুক যেন মাটিতে লেগে যাবে । বুগিয়ালের ঘাস হাঁটুর কাছাকাছি ‘বাবুজী ধীরে চল না, প্যয়র কো যারা সমহল না..’

‘থোড়া রেস্ট লে লো, অব সে খড়ি চড়াই চড়নি পড়েগি..’

ভাই ডে প্যাক ফেলে দিয়ে বললো ‘এখন আমি চতুস্পদ হয়ে যাবো, দু’পায়ে এ চড়াই টানা আমার কম্মো নয় ভাই..’  বুগিয়ালের ঘাসের তলায় কোথায় বোল্ডার, কোথায় গর্ত, কোথায় জমাট বরফ,  কিছুই মালুম করা যাচ্ছেনা । সত্যি সত্যিই টনাটন চড়াই । অনেকটা উঠে এসেছি । অনেক নিচে আপার সুখরাম ময়দানটা দেখা যাচ্ছে । চোখের সমান্তরাল রেখার একটু নিচে ও দূরে দেবী-কুন্ড ও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । সুখরাম নালার গর্জটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে । এমন জায়গায় দু-পাঁচ মিনিটের রেস্ট বেশক জরুরী।

ঝকঝকে আকাশ, সোনাঝরা রোদ্দুর, সোনালী সোনালী বুগিয়াল..শুধু চড়াইটা বড্ড চড়চড়ে। লাং ফাংশানিং এর টেস্ট চলছে যেন।

‘ক্যাম্প কা হুইসেল লাগাও লিডর ..’ বেলা সবে ১১:৩৫, আরো ঘন্টা খানেক সময় হাতে আছে , ওয়েদারও অসাধারন চড়াইয়ের টং দেখা যাচ্ছে না, অথছ এখন ক্যাম্প লাগানোর হুইসেল? চারপাশে তো ক্যাম্পিং কোন জায়গাই নজরে আসছে না। ঢালানটা সিধে নেমে গেছে, এখানে ক্যাম্প? মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে নিশ্চিত ।

‘দূর্গা, ক্যাম্প লাগা, টাইম কম হ্যয়..’

‘সমঝ গ্যায়া .’

কি যে সমঝালো , কি ই বা সমঝেছে ,কে জানে ? আকাশ তো ফকফক করছে । কথা শেষ, তুন থেকে তির বেরিয়ে গ্যালো তিন-তিনটে । ডানদিকের বুগিয়ালে বেরিয়ে গেলো তিনজন । ‘ডাইনে কাটো, ওদের দিকে ..’

গতির সাথে পাল্লা দেওয়া বেশ মুশকিল । বিশেষতঃ এমনধারা ঢালানে । ওরা ততক্ষনে ঘুড়ির মত টিপ হয়ে গেছে । ১২ টার মধ্যে ক্যাম্প রেডী, ক্যাম্প তো নয় যেন উলটো করে গাছে ঝোলানো কারবার । গে লাইন (টেন্টের দরজা) আবার ঢালানের দিকে । বে-আক্কেলে কারবার। কিচেনের ঢং ও বেঢপ ।  প্লাস্টিকটার মাঝে তিনটে ওয়াকিং পোল খাড়া করে চারদিকে পেগ মেরে আটকে দিয়েছে । ঠিক মত ঢোকা বা বেরোনোও মুসকিল। কি যে হচ্ছে, কেন যে হচ্ছে, কিসুই বোঝা যাচ্ছে না।

‘সব কিচেন পে আ যাও , টেন্ট কা জিপার লগা দো, আউটার ফিক্স কর দো , এক এক পাথ্থর লগা দো চারো তরফ ’

কিচেনে চারদিকে গোল টেবিল বৈঠকের ঢং এ গোল করে বসে , ঝেড়েই দিলাম রাগটা .. ‘এখানে ক্যাম্পের মানে কি? যখন যা বলবে সেটাই মানতে হবে? একটা দিন ফালতু নষ্ট করার মানে আছে কিছু?’

৫ মিনিটও কাটেনি কথা শেষ করার । চারপাশ অন্ধকার করে কোহড়া ঢেকে ফেললো সমস্ত  বুগিয়ালটা। কিচেন শুদ্ধু অন্ধকার । তারপরে কিচেন উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মত হাওয়া সাথে বরফের তুমুল বৃষ্টি। সবশুদ্ধু উড়ে যাবো মনে হচ্ছে ।

‘প্লাসটিক জমকে পকড়ো , কঁহি উড় না যায় ..’  

জ্যাকেট ফুঁড়ে যেন কেউ ব্লেড দিয়ে পেছনটা চিরে দিচ্ছে বসে থাকা যাচ্ছে না । কিছুক্ষন আগেও যে সোনালী বুগিয়াল আর ঝকঝকে নীল আকাশ দারুন মুগ্ধতা এনে দিয়েছিলো , সেটাই এখন যেন এক ক্ষিপ্ত দানবী । কি ভয়ানক রূপ তার । কিচেনের প্লাসটিক নেমে আসছে ওপরে জমা বরফের চাপে । বাইরে বেরিয়ে পরিষ্কার করবে কে ? ক্যাম্প লাগানোর হুকুম আর এখনকার মধ্যে সময়ের ফারাক মাত্র ৫৫ মিনিটের, এর মধ্যে চারপাশে লন্ডভন্ড ব্যাপার..

‘অপনে জাগাহ পে ডটে রহো । হিলনা নেহি । ডরনা মত । উপর হাথ চলাতে যাও, বরফ আপনে আপ সাফ হো যায়গা ..’ চড়াইটার যা চেহারা তাতে দু ঘন্টাতেও টং টায় পৌঁছতাম কিনা কে জানে ? যদি রাস্তার মাঝে এসব কারবার শুরু হতো ? জমে জমাট কান্ড হতো । বাপ রে ! এর থেকে সুখরামের চ্যাপ্টার অনেক কুল ! শেল্টার মেকিং, ফায়ার মেকিং.. এ সব তত্ব বেরিয়ে যেতো তেপান্তরে বেড়াতে ! বুড়োগুলো নির্বিকার , যেন রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে এমন হাবভাব!

‘কফি পিও, পকোড়া খাও, বডি গরম রাখ্খো , গপ্পে মারো ..’  

হাঁড়ের ভেতরে ঢুগঢুগি বাজছে আর এদের কারবার দেখো  ? পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে । খিস্তি মারতে ইচ্ছে করছে ।

‘ব্যস ,কল আপার থুনি ক্যাম্প, ওর মজা হি মজা.. কিঁউ লিডর সাব ?’

বিকেল ৫টা পর্যন্ত দানবীয় কাজ কারবার চললো উপত্যকা জুড়ে ! মুভমেন্ট চালু রাখলে কি যে হতো, ভাবলেই শরীরে আরো শীত লাগছে …

একি টেন্ট নাকি ছোটবেলার স্লিপ চড়া ? শুলেই হড়হড়িয়ে নেমে যাচ্ছি নিচের দিকে । ঘুম গেছে মাসির বাড়ি । কাজের কাজ একটাই হয়েছে , বিকেলে জানতে চাওয়া হয়েছিলো ,আর কতটা মুভমেন্ট হবে ? আপার থুনি বড়োজোর আর কিলোমিটার দুয়েক, তবে চড়াইটার কারনে টাইম বেশী নেবে । তারপর ডানদিকে থারকোট বেস ক্যাম্পের দিকে মুভ হবে নাকি সেইম রূটে ব্যাক? ব্যাক ফুটে ছক্কা মারার স্টাইলে খেলে দিয়েছি……

‘পিক ভানুটি’ …

বাইরে প্রকৃতি তখন  দানবীয় নেত্তকলা সেরে ঠান্ডা ঠান্ডা কুলকুল ! যেন কিছুইতো হয়নি এমন ভাব ! কিচেনের ভেতরটায় দুপুর সাহারার উত্তাপ !

‘পিক ভানুটি ? মতলব ? করনা ক্যায়া হ্যয় ভানুটি পে ?’

জানি অসম লড়াই , তবু লড়ে যাবো । ৪:২ মানে ২:১ এ লড়াই হবে এটাই নিশ্চিত ছিলাম । আমি আর ভাই এক দিকে , অন্যদিকে চারজন ।

‘সামিট ..’

‘ক্যায়া ? পিক বাপ কা জাগির হ্যয় কা ? যো চাহে পিক পে চড় যায়ে ?’

‘উসকে লিয়ে তৈয়ারী জরুরী হ্যয়..’

‘হম লোগ পুরে তৈয়ারীকে সাথ আয়েঁ হ্যয় ..’

কিচেনের ভেতরের উত্তাপ সাহারার উত্তাপকেও হার মানাবে তখন । আচমকা চন্দু এ পক্ষে ।  জমজমাট লড়াই । উত্তাপের পারা নামতে নামতে সন্ধে ৭ টা । জিত আমাদের । অনেক যুক্তি খরচ করতে হয়েছে এই জিত এর জন্যে । ডিনারে লেট ।

ঠিক হলো , সকালে বাবা বেরিয়ে যাবে, ক্যাম্প ১ লাগাবে , রোপ ফিক্স করবে সুবিধা মত জায়গা দেখে । আমরা ব্রেকফাস্ট আর প্যাক লাঞ্চ রেডী করে রওনা দেবো ,ক্যাম্প ১ অকুপাই করবো । ক্যাম্প রেডী হবে ভাইয়ের চলার গতি মাথায় রেখে । দরকার হলে ২ নং ক্যাম্প বা সামিট ক্যাম্প লাগবে । না হলে একটা ক্যাম্পেই সামিট । ভানুটির একচুয়াল লেফট সোল্ডার দিয়ে মার্চ হবে । সামিট করে , একচুয়াল রাইট সোল্ডার ধরে সোজা নেমে আসা । সব ঠিকঠাক চললে আগামীকাল সামিট সেরে সোজা থুনি নেমে আসবো । নচেত আগামী পরশু । ভানুটি ১৮,৫০০ বা ১৮,৭০০ ফুট । মার্চিং পিক । জানুয়ারী থেকে তিলতিল করে তৈরী করা প্ল্যান অবশেষে সাকসেস পেতে চলছে । হিসেব অনুযায়ী (পুরোনো ম্যাপ অনুযায়ী) ,আমরা থুনি বুগিয়ালের প্রায় শেষ প্রান্তে, মেরেকেটে থুনির শেষটা আর দেড়  কিলোমিটার বা দু’কিলোমিটার। কিন্তু আজ এমন বেমক্কা জায়গায় ক্যাম্প লাগাতে , ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছি না ।

সকালটা আজ আর ততটা বোরিং নয় । লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি , এটা ভাবলেই একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে । নিয়ম মেনেই সকাল হয়েছে । ৪:৪৫ এ ‘গরররমম  চায়য়য়য়..’ । দু’চারটে বিষাদ বাণীও শোনা গেছে ….. ‘পহলে প্ল্যান বতায়ে হোতে তো ইতনা চড়াই চড়না নেহি পড়তা । দেবীকুন্ড – নাগকুন্ড হোতে হুয়ে নিকল যাতে..’

বাবা বললো  ‘আপনি মুহল্লেমে সব গামা, পাহাড় পে স্রিফ লামা..’

সকালটা সত্যিই সোনাঝরা ! বুগিয়ালে রোদ ঢুকেছে সকাল ৫ টার মধ্যে ! শ্লিপিং ব্যাগ , ম্যাট, সব শুকোনোর পালা চলছে । কিচেনে ফাইনাল রাউন্ডের ব্যস্ততা । বাবা ধরাচুড়ো পরে বেরিয়ে গেছে ঠিক ছ’টায় । আমরা ক্যাম্প গুটিয়ে মার্চ করবো ৭ টায় ।

আগে এই রূটে ট্রেকার-ক্লাইম্বারের ভীড় থাকতো । এখন খুব কম লোকজন আসেন । কারন জানিনা । দমদম  কিশোর ভারতী স্কুলের ক্লাস সেভেন এইটের ছাত্ররা থারকোট সামিট করেছিলো বহু বছর আগে , এটা শুনেছি । আমাদের আসার কটা দিন আগেই , কলকাতার বিখ্যাত একটি ক্লাব , থারকোট সামিটের জন্য এসেছিল । কিন্তু তার ডিটেলস দূর্গা বা তারা দাদার জানা নেই । ওরা তখন খনখনিয়াতে ক্যাম্প করেছিল । ফলে , রূটের খবর ওদের কাছে ছিলো না । সকালের রোদে বুগিয়ালটা আরো সোনালী হয়ে উঠছে । যেন কাঁচা সোনা । রওনা দেওয়ার সময় হয়েছে । সকাল ১০ টার মধ্যে ক্যাম্প অকুপাই করে ফেলবো আশা রাখি । মুভমেন্টের হুইসেল মারার টাইম হয়ে গেছে….

চলতে আর কষ্টই হচ্ছে না একফোঁটাও । বুগিয়ালটা যদিও আমাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে মুভমেন্টকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে চলেছে প্রতি সেকেন্ডে । ডেসটিনেশন খুব কাছে নাকি আমাদের প্ল্যান সাকসেস এর পথে এই ভেবে চলতে কষ্ট হচ্ছে না কিনা তা বুঝতে পারছি না । সোনা ঝরা রোদ্দুর , সোনা রঙা বুগিয়াল, সোনালী অতীতের গল্পে মসগুল দূর্গা আর  তারা দাদা ! কে কতবার ক্লাইম্ব করেছে, কি কি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে , তার লিস্ট যেন চোখের সামনে তুলে ধরছে ওরা ! মসগুল হয়ে শুনতে শুনতে পার হয়ে যাচ্ছে সময়, হার মানছে চড়াইটার আপাত বেপরোয়াপনা ঢালান । চন্দু ,আমার আর ভাইয়ের এটাই প্রথম ক্লাইম্বিং হবে (যদি সাকসেস হয়) । আমাদের তিনজনের ভালোলাগার অনুভুতিটা একেবারে ভার্জিন ভালোলাগা । আকাশ হাসিমুখো , বাতাসে অক্সিজেনের অভাব হাল্কা অনুভুত হচ্ছে ।

‘মৌসম পুরা সাথ দে রহা হ্যায় । কল ভি অগর এ্যয়সা হি রহা তো সিধা খিঁচেঙ্গে সামিট..’

‘কিঁউ রে আকাশ ? অগর চড় নেহি পায়েগা তো কন্ধে পে উঠাকে লে চলেঙ্গে সামিট..’

সকালে বাবাকে ঠাট্টা করে বলা হয়েছে ‘কোথাও দাঁড়িয়ে পড়ে গান গেয়ে সময় নষ্ট করো না যেন.’ , কিন্তু আমার নিজেরই এখন গান গাইতে ইচ্ছে করছে ‘..সুহানা সফর  ঔর এয়ে মৌসম হঁসি / হমে ডর হ্যয় হম খোঁ না যায়ে কহিঁ..’

‘বস, উস ধার কে বাদ চড়াই ভি খতম ঔর বুগিয়াল ভি খতম ..’

টং টা সামনেই , চড়াই খতম হতে আর বেশী বাকি নেই । বাবা নেমে আসছে টং টার কাছে । ওটা এখন আর আমাদের চমক দেয় না , জানা থিয়োরী । Go up, slip low .. আমরা না পৌঁছনো পর্যন্ত বাবা ঘুম মারবে , এসব এখন  জলভাত আমাদের কাছে । গতকাল রাতে একবার বলেছিলাম , এ যাত্রায় হিমালয় আমাদের কিছু দিলো না । প্রতিবারই কিছু না কিছু পাবোই পাবো , আমাদের চাওয়াও হিমালয়ের কাছে অতি ক্ষুদ্র , কখনো সেটা সজারুর কাঁটা,কখনো আইবেক্সের শিং, কখনো বা জঙ্গলের নিজস্ব খাজানা আখরোট , কিংবা কখনো কৃষ্টাল (যদিও সেটা খুবই কম পেয়েছি) । এবার এক্কেবারে খালি হাত । আজ সকালে ক্যাম্প ছাড়ার আগে বাবা উত্তর দিয়ে গিয়েছিলো , ‘হিমালয় কভি খালি হাত নেহি লওটাতা, ঝোলি ভরকে দেগা, যো দেগা ওহ ঝোলা উঠা নেহি সকগে ..’  

টং এ পৌঁছে গেছি । মুখস্ত করা ম্যাপটা ১০০ % নিখুঁত । গ্রাসল্যান্ড শেষ , একটা ছোট্ট ময়দানী জমিন । 

গ্রাসল্যান্ড শেষ , একটা ছোট্ট ময়দানী জমিন । ডানহাতে থুনি বুগিয়ালের গার্ডওয়ালও শেষ । ডানদিকে ,থারকোট বেস ক্যাম্প যাওয়ার চড়াইটা হাঁক পাড়ছে , ‘ চলে আয় এদিকে ,ওদিকে মজা কম’ , বাঁদিকে আমাদের স্বপ্নের সড়ক… ভানুটি । বাবার দেদার ঘুম , ক্র্যাস কোর্স ফুল দমে চালু । ‘ডিজেল বনা লেতে হ্যঁয় , নেহি তো গাড়ী পলটি মারেগী ..’  বাবাকে ছাড়িয়ে, ৫-৭ মিটার এগিয়ে , ঝপাঝপ লোড নামানো হল । লোডগুলো বৃত্তাকারে সাজিয়ে ,গ্যাস স্টোভটা মাঝে রেখে, চায়ের প্রস্তুতি শুরু । বেশী সময় নষ্ট করা যাবে না এখানে । ক্যাম্প অকুপাই করার পর অনেক কাজ আছে । রোপ ফিক্সিং, লোড ফেরী, আর ক্যাম্প লাগবে কিনা সেটা দেখা , বরফের হাল-হকিকত বোঝা..প্রচুর কাজ । মৃগথুনির দিক থেকে বেশ জোর হাওয়া বইছে, স্টোভ জ্বালানোটাই মুসকিল হচ্ছে । কিন্তু চা বানাতেই হবে , এমন পণ করে দূর্গা আর তারা দাদা লেগে পড়েছে । নইলে ঘুমন্ত গাড়ী আর চলতে চাইবেনা । হাতে কিছুটা সময় আছে ক্যামেরা চালাবার ..

ময়দানী জমিনটার ডানদিকে মোটামুটি আড়াই বা তিনটে হাম্প পেরোলেই পৌঁছে যাবো প্রত্যাশিত ক্যাম্পে । বাবা ডানদিকে ঘাড় কাত করে ঘুমোচ্ছে । মাথায় ক্যাপের উপরে এখনো কিছু বরফ জমে আছে, জ্যাকেটের সোল্ডারেও তাই । একটু রেইকি মেরে নেওয়া সাথে ক্যামেরার খচাখচ .. পুরোনো ডায়েরী আর হাতে আঁকা লাইন ম্যাপ যেন ছবি, নিখুঁত বর্ণনা দিচ্ছে আমার সামনে । চা রেডী । এবারে একসাথে ডিজেল পান , তারপর…

আজ ৩ দিন হলো বাগেশ্বরে এসেছি । আপার থুনি থেকে হিসেব করলে ৮ম দিন আজ । অনেক ঝড় বয়ে গেছে এ কটা দিনে । হিমালয় আমাদের ঝোলা ভরে দিয়েছে । যার বোঝা বওয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিলো না , এখনো নেই । এখন ঝড় আপাতঃ স্থির । তাই সব লিখবো । ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড , আনা-সিকি-পাই , সব লিখবো । আপার থুনি থেকেই লিখবো প্রতিটি মুহুর্তের কথা । আর এটাই হবে লিডার’স রিপোর্ট..   

চা হয়ে গেছে , দূর্গা দাদা চা নিয়ে নেমে গেছে বাবাকে দিতে, চা পেলেই গাড়ী আবার গড়াতে শুরু করবে । তারা দাদা লাস্ট এ্যান্ড ফাইনাল প্যাকিং এ ব্যস্ত । আমি, চন্দু আর ভাই বাবার দিকে নামছি , দূর্গা দাদা চেল্লালো ‘দাওয়াই কা বাক্সা নিকাল তারা..’

দ্রুত নেমে এলাম তিনজনেই । তারা দাদাও ঠিক পেছনেই । কি হয়েছে , বুঝতে পারছি না । বাবার মুখটা এমনিই খুব কালো , রোদ আর বরফে পোড়া কালো । কিন্তু বাবার মুখে এখন যেন কেউ আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে । তারা দাদা পালস দেখার চেষ্টা করছে । ‘দাওয়াই কা বাক্সা জলদি নিকালো লিডর ..’    

দাওয়াই কা বাক্সা ? পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে । সব এনেছি, কিন্তু ওইটাই প্যাক করিনি । কারন প্রতিবার গুচ্ছের ওষুধ বয়েবয়ে আনা হয় আর সেগুলো বিলোতে বিলোতে যাওয়া হয় , আজ পর্যন্ত কখনো কোনোদিন আমাদের একটা ওষুধও লাগেনি । ‘দাওয়াই কা বাক্সা জলদি নিকালো লিডর , টাইম বহুত কম হ্যয়..’  

টাইম বহুত কম হ্যয় ? মানে ? কি হয়েছে ? এবার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি , বাবার মুখটা ডানদিনে কাত করা ,শরীরটা সামান্য কেঁপে মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোলো । এমনতো কখনো দেখিনি বাবাকে ! বাবার ফিজিকাল ফিটনেস নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন জাগেনি আমাদের । কিন্তু এমনটা কখনো দেখিনি । তারা দাদা পাগলের মত কি খুঁজছে । দূর্গা দাদা বললো ‘তারা ; রোপ নিকাল , স্ট্রেচর বানা জলদি..’ স্ট্রেচর ? কেন ? কি জন্যে ? বাবার শরীরটা আবার সামান্য কেঁপে মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোলো । তারা দাদা বাবার মুখের কাছে ঝুঁকে চিত্কার করে বলছে ‘..ধোকা মত দেনা আঙ্কেল…’

বাবার পালস ধরলাম, ৩০- ৩৫ পালস রেট ! ভয়ঙ্কর কিছু হতে চলেছে ! ‘লোড ছোড় দো এঁহিপে , টেন্ট উঠাও তুম তিনো , হম দোনো আঙ্কেলকো লেকে নিচে ভগতে হ্যঁয় বালুনি তক, আ যাও তুরন্ত, নেহিতো বচানা মুসকিল হ্যয় ..’ ..বচানা মুসকিল হ্যয় ? কি বলছে ওরা এসব ? ওরা পারছেনা বাবাকে ঘাড়ে ওঠাতে ! তাতে রক্ত বমি আরো বাড়ছে ! তাতে নিজেদের ওপর খেপে যাচ্ছে ওরা ! কুঁমায়ুনিতে , চন্দুকে সজোরে বকা দিয়ে কিছু বললো ওরা , চন্দু বললো ‘ লিডর সাব , চলো আগে নিকলে বালুনিকে তরফ , ক্যাম্প লগাতে হ্যয় , পাপা ঔর চাচা বুবুকো নিচে লে অয়েঙ্গে ,  চলো..’   মনে পড়ছে, বাবা প্রতি ট্রেকে কমন ডায়লগ বলতো,  ‘ যখন প্রকৃতি তোমাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলবে , তখন মাথাটা বরফের মত ঠান্ডা কোরে জবাবের চেষ্টা কোরো, নো তাড়াহুড়ো , নো জল্দবাজী..’   

আমাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে , যুঝতে হবে, কমান্ড সামলাতে হবে , নো জল্দবাজী ! আমাদের সামিট চাই না, বাবাকে চাই । তারা দাদা  হাউহাউ করে কাঁদছে , দূর্গা দাদার মুখ কালো ! মাথায় চাপড় মারছে ! আমি বুঝতে পারছিনা , ওপরে কি এমন ঘটলো ! বাবার হাতদুটো ধরে দু’ভাই দুপাশে বসলাম ! তারা দাদা সমানে কাঁদছে আর এক কথা বলে যাচ্ছে,  ‘..ধোকা মত দেনা আঙ্কেল…’  

এতো সহজে বাবা লড়াই ছেড়ে দেবে ? হতেই পারে না ! লড়বে, সমান সমান লড়াই ! বাবাকে চিনি আমরা ! কিন্তু এখন সেই বাবাকে যেন খুঁজে পাচ্ছি না ! বাবা ডানহাত নাড়ছে, কিছু খুঁজছে যেন ! তারা দাদা আইস এ্যক্সটা ধরিয়ে দিলো হাতে ! বাবা নড়ছে , যেন উঠে বসতে চাইছে ! সবাই মিলে ধরে বসালাম ! কেউ কথা বললে , যেন সে মঙ্গল গ্রহ থেকে বলছে , এমনভাবে বাবা শোনার চেষ্টা করছে ! বমি হচ্ছে ! শুধু রক্ত ! এতো রক্ত কখনো দেখিনি ! দু’ পায়ে দাঁড়াতে পারছেনা ! দু’দিকে তারা দাদা আর দূর্গা দাদা সাপোর্ট দি্চ্ছে ! তারা দাদা সমানে বলে যাচ্ছে এককথা  ‘..ধোকা মত দেনা আঙ্কেল…’

‘স্যাক হল্কা কর দে , পিছে গিরেগা তো চোট নেহি লাগেগা…’  আমরা বাদে কেউ নেই, কোনো সাহায্যই পাওয়ার নেই কোথাও ! কি করে এতোটা পথ পার করবো ? বাবা উঠে দাঁড়াচ্ছে, লড়াই ছেড়ো না বাবা..

ভাই কমান্ড হাতে নিয়ে নিলো , ‘কোই আগে ইয়া পিছে নেহি যায়েগা , সব একসাথ মুভ করেগা ,পাপা হামারে সাথ চলেগা..’ ৭ থেকে ৮ বার হুইসেল বাজালো বাবার সামনে , S.O.S হুইসেল ! বাবার কানের কাছে চিত্কার করে বললো ‘বাবা আমরা বিপদে পড়েছি, হাইট প্রায় ১৮০০০ , আমাদের রেসকিউ করার কেউ নেই , বাবা..’ .. বাবার চোখ দুটো স্থির ! যেন অনেক দূর থেকে আসা শব্দ অতি কষ্টে শোনার চেষ্টা করছে … বাবা ঘাড় নাড়ছে, লড়ো বাবা লড়ো ! কতদূর তা জানি না , কিন্তু দূর্গা দাদা বলেছে , মিনিমাম বালুনি পর্যন্ত নিয়ে যেতেই হবে , নাহলে বাঁচানো যাবে না ! এটা হতে পারে না , বাবাকে হারতে দেওয়া যাবে না ! স্ট্রেচার বানাতে গিয়ে ওয়াকিং পোলগুলো ভেঙেছে, একটাও গাছের ডাল নেই এই ১৮০০০ ছুঁই ছুঁই উচ্চতায় ! এতোটা পথ পেরোবো কি ভাবে ? বাবার শরীরটা থরথর  করে কাঁপছে ! কিছু যেন বলতে চাইছে বাবা ! তারা দাদা মুখের কাছে কানটা নিয়ে শোনার চেষ্টা করছে… ‘জলদি ওয়াকিং পোল নিকালো..’

বাবার মাথার শিরা ফুলে উঠছে , দাঁতে দাঁত ঘষার আওয়াজ পাচ্ছি স্পষ্ট ! রোপ আপ করানো হলো বাবাকে, নচেত্ এই ঢালানে নামাবো কি করে ? ভাইয়ের S.O.S হুইসেল আর ‘আমরা বিপদে পড়েছি’ এ দুটো খুব কাজ দিয়েছে মনে হচ্ছে ! ‘আমরা বিপদে পড়েছি’ , এটাই বাবাকে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে বাধ্য করবেই ! ‘কিসি কারন ভূমিয়াল দেবতা রূঠ গয়ে হ্যয়, পূজা চড়াকে ফির চলতে হ্যয়..’ …এখন আমরা সব কিছু করতে রাজী ! বাবাকে আবার দাঁড় করানো হলো, চেষ্টা করা হলো দুপাশে সাপোর্ট দিয়ে নামানোর , কিন্তু অসম্ভব সেটা ! বাবা চেষ্টা করছে .. ঢালান বরাবর বাবা গ্লিসেড করা শুরু করে দিয়েছে ! কিছুটা নেমেই শুয়ে পড়ছে ! তবু লড়ার চেষ্টা করছে ! তারা দাদা আর চন্দু চলে গেলো ওপরে ফেলে আসা মাল  নিয়ে আসার জন্যে….

বেলা তিনটেতে, অনেক কসরতের পর, তল্লা সুখরাম পর্যন্ত পৌঁছনো গেলো বটে কিন্তু বাবার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ছে । আর মুভ করানো সম্ভব নয় । তারা দাদারা ওপর থেকে না নামলে সুখরাম নালা ক্রস করানো অসম্ভব আমাদের তিনজনের পক্ষে । তল্লা সুখরামে সেই কোহড়ার ঘন আস্তরন । দ্রুত একটা টেন্ট পিচ করে বাবাকে শ্লিপিং ব্যাগে ঢোকানো হল । বমি ক্রমাগত বাড়ছে, টেন্ট নষ্ট । যাওয়ার সময় , ক্যাম্প সাইট ক্লিনিং এ , কিছু টিনের কৌটো পাওয়া গিয়েছিলো, সেগুলো কাজে লাগছে এখন । তারা দাদারা ফিরলো বিকেল ৫ টায় । ওপর থেকে নামার সময় ওরা নাকি বালুনিতে টেন্ট দেখতে পেয়েছে । যদি ওখানে কিছু সাহায্য পাওয়া যায় এই আশায় ওরা দুজনে বেরিয়ে গেলো বিকেল ৫:৩৫ এ । যেন এক অনন্ত প্রতীক্ষা । ‘হাওড়া কা এক টিম হ্যয়, রূপ সিং সাথ মে হ্যয়, দো লোগ ঔর দো পোর্টার নিচে হ্যয় , বাকী লোগ উপর । মগর , ইয়ে লোগ কোই ভি পোর্টারকো নেহি ছোড়েঙ্গে । দো দাওয়াই দিয়ে হ্যয়..’ দুটো জেলোসিল ট্যাবলেট দিয়েছেন ওঁরা । সন্ধ্যে ৭:৪৫, আর কোনো আশা নেই আরো নিচে নামানোর । বড্ডো ভয়ঙ্কর আজকের রাত…

গতকালের  রাতটা এক ভয়াবহ রাত আমাদের  জীবনে । মাত্র ৫-৭ কিলোমিটারের আওতার মধ্যে থাকা একটি মাউন্টেনিয়ার ক্লাবের দল থাকা সত্ত্বেও তারা সাহায্যের জন্যে এলো তো না , এমনকি পোর্টারদেরও ছাড়লো না । দুজন লোক পেলে হয়তো বাবাকে রাতারাতি কাঁঠালিয়ায় নিয়ে যাওয়া যেত । সাহায্য এলো না । রাত যত বাড়ছে বমি ততই  পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, শুধু রক্ত । বাবার কোনো চেতন নেই । যাই খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে , সব বমির সাথে বেরিয়ে আসছে । শুধু মাঝে মাঝে , একমুখ হাসি , ওই অচৈতন্য শরীরটাতে প্রাণের আশ্বাস জাগাচ্ছে আমাদের মনে । রাত ৯টা নাগাদ দূর্গা দাদা প্রথম নজরে আনলো বিষয়টা .. ‘বাহার কোই হ্যয়..’ .. আবছা আলোয়, টেন্টের বাইরে , কেউ বা কারা যেন হাটছে , সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । সাহায্য তাহলে এসেছে । বাইরে বেরোতে যাবো, দরজা আগলে বসে থাকা তারা দাদা , লোহার মত শক্ত হাত দিয়ে এক টানে বসিয়ে বললো, ‘..চুপচাপ বৈঠে রহো..’ ওরা বাবাকে  নিচে নামাতে চায় না ? সাহায্য এসেছে অথছ টেন্টের ভেতর বসে থাকবে ? দু ভাই সজোরে প্রতিবাদ করলাম ! বাবার মাথাটা কোলের মধ্যে নিয়ে বসা দূর্গা দাদা বললো , ‘সব মিতুয়া (সোলার ল্যাম্প) জ্বলা দো, কোই নিকলেগা নেহি, বাহার দেখো মত, কোই নেহি হ্যয় বাহার …’  

‘হম সব লোগ দেখ রহে হ্যয় , বাহার আদমী হ্যয় , ওর আপ কহ রহে হো কে কোই নেহি হ্যয় ?’ ….

‘চুপ হো যা আকাশ !  ইয়ে তল্লা সুখরাম হ্যয় ! রাত কাটনে দে,  সুবহ হোতে হি আঙ্কেলকো  কন্ধেপে উঠাকে হম দো ভাই নিকল যায়েঙ্গে ! বস ; অভি চুপ হো যা, বাহার মত নিকল..’

গা কেমন ভার হয়ে গেলো ! বাবার সাথে চলতে চলতে , নানান বেয়াড়া জায়গায় ক্যাম্প লাগিয়েছি , কোনোদিন এমন কিছু দেখিনি, ঘটেওনি কিছু ! কিন্তু আজ ? ছোট্টবেলা থেকে ভুত-প্রেত, দত্তি-দানো সম্পর্কে বাবা আমাদের শিখিয়েছে ‘মনের ভ্রম’ ..

‘হম নিকলেঙ্গে, লিডর কা বাত মাননা পড়েগা, এক জান কা সওয়াল হ্যয়..’   

.. সব কটা মিতুয়া জ্বালিয়ে দিলো তারা দাদা, ‘সব হেড ল্যাম্প অন করো, পহলে হম, উসকে পিছে বাকি..’ একহাতে জ্বলন্ত ধুপকাঠির গোছা , অন্য হাতে খুকরি । ঠিক পেছনে দূর্গা দাদা, হাতে আইস-এ্যাক্স ! মাঝে আমি পেছনে চন্দু ! ভাই রইলো বাবার কাছে ! টেন্টের জিপার আটকে দেওয়া হলো বাইরে থেকে ! হেডল্যাম্পের আলো ফালাফালা করে দিচ্ছে উপত্যকার আঁধার ! কি আশ্চর্য , গোটা তল্লাটে আমরা ছাড়া কেউ নেই , তা হলে , টেন্টের ভেতরে বসে যা দেখলাম সেটা কি ? ভাই ডাকলো, ‘ দাদাই বাবা আবার হাসছে , ভেতরে আয় ..’

টেনটের চারকোনায় ধুপকাঠি জ্বালিয়ে পুজো দিচ্ছে দূর্গা দাদা, বাইরে দুটো মিতুয়া রেখে দেওয়া হলো জ্বালিয়ে ! মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না ! বাকী রাত বাইরের মিতুয়ার আলোয় সকলেই দেখেছি, কারা যেন ঘুরছে টেন্টটাকে ঘিরে বড্ড নিঃশব্দে ! বাবার পালস ক্রমশ নামছে ২৫-৩0 ! দূর্গা দাদা বললো, ‘ তুম দো ভাই মিলকে পাপা সে বাঁতে করতে যাও, চুপ মত হোনা..’ বড়ো কাজের দাওয়াই বাতলেছে দূর্গা দাদা ! আমরা দুজনে সমানে কথা বলে গেছি বাকী রাত, পালস রেট একটু বেড়ে স্টেবল হয়েছে , ৪০ এ আটকানো গেছে ! দূর্গা দাদা বললো, ‘আকাশ, তু বোলতে যা কে টিম রেসকিউ করনা হ্যয়, আগে পিছে রেসকিউ করনেওয়ালা কোই নেহি , রুকনা মত, খালি এ হি বোলতে যা !’ …চমত্কার দাওয়াই ! বাবা কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছে এটা শরীরের ছটফটানিতে স্পষ্ট ! ঠিক সাড়ে চারটতে গ্যাস-স্টোভে ফিকি চায় বানাতে বসলো তারা দাদা ! গতকাল আপার থুনিতে শেষ চা খাওয়া আমাদের ! তারপর কেউ কিছু খাইনি ! পাক্কা একটি ঘন্টার কসরতের পর বাবাকে বসানো গেলো, ফিকি চায় গেলানো গেলো চার-পাঁচ চুমুক ! উপত্যকায় রোদের আভাষ মিলছে, প্রাণে একটু জল আসছে ! ঠিক হলো, বাবাকে একটু দাঁড় করানো গেলেই, তারা দাদা এসকর্ট করে নিয়ে যাবে , বাকী লোড আমরা ভাগাভাগী করে রওনা দেবো ! হঠাত্ তারা দাদা নাটক শুরু করলো , ‘এ দা ; আকাশ-অরণ্য কো রেসকিউ করনা হ্যয়, দো বচ্চে নেহি তো মর যায়েগা, উপর মৌসম বহত বিগড় গ্যয়া , এ দা…’ …পাগলের মতো ডাফেল খুলে হাতড়াচ্ছে আর সাথে চিত্কার ! আমরা হতবম্ব ! কি হচ্ছে এসব ? দূর্গা দাদা দৌড়ে কোনো রকমে বাবাকে ধরলো, বাবা দাঁড়িয়ে পড়েছে ! সিনেমা দেখছি নাকি আমরা ? অবিশ্বাস্য সব কাজ কারবার ঘটে চলেছে একের পর এক ! চন্দু বললো, ‘তুম দোনো  বুবু কে নজর সে থোড়া পিছে খিসকো..’

দূর্গা দাদা জোরে জোরে বলছে ‘কুছ নেহি, দো ভাই ওর চন্দু উপর গধেড়েকে চট্টানো মে ফঁস গ্যয়ে ! আপ ওর তারা ইস সাইড সে মার্চ করো , হম উপর উপর সে রশ্শি লাগাতে লাগাতে পোঁছতে হ্যয়..’  মিরাকল ঘটছে , জাস্ট মিরাকল ! বাবা দু পায়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে , জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে, বার করছে !

‘তারা, নিকল যা জলদি..’

বাবার একটা হাত ধরে তারা দাদা রওনা দিলো ,বাবা টলছে কিন্তু যেন কোনো এক তাড়নায় এগিয়ে যাচ্ছে বেশ গতিতেই । যে গধেড়া দিয়ে নেমেছিলাম সেই গধেড়া দিয়েই বাবাকে ওঠাচ্ছে তারা দাদা । গা টা একটু শিউরে উঠলো । কিন্তু যেতে তো হবেই! দ্রুত লোড প্যাকিং করে বেরতে হবে, চোখের আড়াল করা যাবে না বাবাকে । মোটামুটি মিনিট ২০ আগে-পিছে রয়েছি ! প্রত্যেক ৪০-৪৫ মিনিট পরপর  ষ্টপেজ দিতে হচ্ছে, বাবার জন্যে । কিন্তু সিচুয়েশন বদলাচ্ছে, যত এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে ততই বদলাচ্ছে । বালুনি টপের নিচের দিকে ক্যাম্পটা দেখতে পাওয়া গেছে । তারা দাদা বাবাকে নিয়ে সেদিকেই মুভ করছে । অতএব  আমাদেরও ওদিকেই ট্রেভার্স করতে হবে । লোড সবারই খুব বেশি পড়েছে । বাবার পিঠ শুধু খালি । এই লোড নিয়ে ডাউন নামা খুব খতরনাক । কিন্তু কিছু করার নেই, নামতেই হবে ওদের ক্যাম্পটা পর্যন্ত । যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায় । হাওড়ার এক সুবিখ্যাত মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব, রূপ সিং  তাদের গাইড । দল আজ আবার ওপরে দেবী কুন্ড গেছে । শুধু একজন মহিলা সদস্যা আর দুজন পোর্টার আছে ক্যাম্পে । বাবাকে ফিকি চায় দিলো ওরা (পোর্টারা)।  ‘ক্যয়া হুয়া বুবু..’ বাবা আবার শুয়ে পড়েছে । পালস স্টেবল , ৪০-৪৫ । ‘..কল রাত ইন লোগোনে হমে ছোড়া নেহি । অগর ছোড়তে তো রাতো রাত আপকো নিচে লে চলতে…’ এখন আর এসব শুনে লাভ নেই, যদি এঁরা কিছু ওষুধ দেন তবে ভালো ; না দিলে কিছু করার নেই । দুটো জেলোসিল দিলেন । কারন, টিমের পারমিশন ছাড়া আর ওষুধ নাকি ইস্যু করা যাবে না । বাবাকে নিয়ে তারা দাদা আসুক ধীরেসুস্থে, কাঁঠালিয়া বেশি দূর নয়, আমরা ক্যাম্পের জোগাড় করি আগে পৌঁছে ।

বাবারা কাঁঠালিয়ায় ঢুকলো বেলা ৪টেতে । বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যে ৬-৩০ আরো বাড়লো বমি । রূপ সিং ও চলে এসেছেন । উনিও খুব বিচলিত । ওনারও একই অভিমত ‘বাঁতে করতে যাও, দিমাগ কো সোনে মত দে না..’ । আমরাও খুব ক্লান্ত , কিন্তু এ ক্লান্তির কাছে হার স্বীকার করা চলবে না । যে ভাবেই হোক, আগে জাতোলী , তারপর সোজা বাগেশ্বর পৌঁছে হসপিটাল । সুতরাং ততক্ষন পর্যন্ত স্টেডী থাকতেই হবে । রাত ৮টার পর সিচুয়েশন একটু স্টেডী, বাবা কথা বলছে, সবার খোঁজখবর নিচ্ছে । চন্দু আর আমরা দুভাই সেফ কিনা সেটা জানতে চাইছে । দিমাগ জাগিয়ে রাখার ওষুধ কাজ করছে । শুধু এখন রাতটুকু কাটার অপেক্ষা…..

সকাল সকাল মুভমেন্ট করা হয়েছে আজ । গতরাত মোটামুটি নিশ্চিন্তে কেটেছে । বাবা নিঃসাড়ে ঘুমিয়েছে । আমাদেরও ঘুম হয়েছে । আজ অনেক স্টেডী মুভ করছে বাবা । সেরাই পৌঁছোতেই বেলা ১২টা বেজে গেলো । খুব শ্লো মুভমেন্ট , কিন্তু কিছু করার নেই । রূপ সিং সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন আজ সকালে , খুবই অনুতপ্ত উনি , ওনার টিমের ব্যবহারে, বাবা সে প্রস্তাব ফুত্কারে উড়িয়ে দিয়েছে । সেরাইতে চা আর সুপ বানানো হলো, যদি বাবাকে কিছুটা হলেও খাওয়ানো যায় । যাওয়ার সময় সেরাই কে বলেছিলাম ,আবার দেখা হবে , কিন্তু সেটা এভাবে হবে জানতাম না ।

বিকেল ৫টায় জাতোলী ঢুকে পড়েছি গোটা টিম । দেদার মাঠ্ঠা খাওয়ানো হচ্ছে বাবাকে । ঠিক হলো, আগামীকাল খুব সকালে পনিতে চড়িয়ে ,সোজা খারকিয়া নিয়ে যাওয়া হবে , সেখান থেকে গাড়ীতে বাগেশ্বর । আগের থেকে অনেক সুস্থ দেখাচ্ছে বাবাকে । শুধু চেহারাটা যেন ধবংসস্তুপ থেকে উঠে আসা মানুষের মতো । আস্তে আস্তে প্রাণের স্পন্দন ফিরছে আমাদের ।

সকালে বাবা বেঁকে বসলো, পনিতে তিনি চড়বেন না তাঁর দাবী , তিনি সুস্থ , অতএব  হেঁটেই খারকিয়া যাবেন । ঘাড় একবার বেঁকে গেলে সোজা করা মুসকিল । অতএব , পনি চললো পনির মতো, আমরা চললাম আমাদের মতো । কোথাও দাঁড়ানো নেই ,বসা নেই, একটানা চলা, সোজা খারকিয়া । খবর পৌঁছেছে এখানেও । রাজুদার চায়ের দোকানে বসতে না বসতেই প্রশ্ন ‘ ক্যয়া হুয়া বুবু ? কেইসে হুয়া ইয়ে ? আপকো তো এইসা কভি নেহি দেখা ?’ এডভান্স টিমে দূর্গা দাদা এসে জগত্ সিং কে রেডী রেখেছে । তাই গাড়ীর ঝামেলায় পড়তে হলো না । জগত্ সিং ই পরিবেশটা হাল্কা করে দিলো , ‘চলো বুবু , সিধে বাগেশ্বর, হাঁসপাতাল পৌঁছনে মে দের হো যায়গি..’

বাগেশ্বরের হাসপাতালে বিকেল ৪টার মধ্যে ভর্তি করানোর কাজ শেষ । আমাদের জন্যে নতুন যন্ত্রনা শুরু । পুলিশ, সংবাদপত্রের লোক, মেডিকেল বোর্ডের কাছে জবাবদিহি … জেরবার হওয়ার মতো অবস্থা । মেডিকেল বোর্ড ভুয়সী প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রায়, আমরা নাকি মিরাকল ঘটিয়েছি । পালমুনারি এডেমায় আক্রান্ত রোগীকে, ওই উচ্চতা থেকে, জীবিত অবস্থায়, বাগেশ্বর হাসপাতাল পর্যন্ত টেনে এনে ভর্তি করানোটা একটা মিরাকেল … এটাই বক্তব্য । প্রায় একই সময়ে শিবলিং এক্সপিডিশনে ৩ জন ফরেনার নাকি একই কারনে মারা গেছেন .. এটা প্রশাষনের বক্তব্য । বাবা জীবিত এবং চিকিত্সায় দ্রুত সাড়া দিচ্ছে ।

আজ ৭ম দিন বাগেশ্বরে । আপার থুনি থেকে হিসেব করলে ১২ তম দিন । মেডিকেল বোর্ডের প্রশ্নের জবাবে বাবার থেকে জানা গেছে , বাবা সামিটের ৫০০ মিটার আগে ক্যাম্প রেডী করে যখন রোপ ফিক্স করতে যাবে , তখনি শরীর খুব খারাপ লাগতে শুরু করে এবং একটু পরেই রক্তবমি শুরু হয় । নিজে বুঝতে পেরে নিচের দিকে নামতে শুরু করে , কিন্তু প্রকৃতি বাধ সাধে । শুরু হয়ে যায় তুষার ঝড় সাথে কার্ণিস ভাঙা । ততক্ষনে বাবার শরীর আরো খারাপ হতে শুরু করে । কোনোরকমে টেনে হিচড়ে ওই শরীর নিয়ে আপার থুনিতে পৌঁছে আর মনে করতে পারেনা কোনদিকে পথ । তারপর তাঁর আর কিছু মনে নেই ।

আমরা ফিরে যাবো আগামীকাল । বিদায় ভানুটি । দারুন শিক্ষা দিয়েছো । বাবা হাসপাতালে হাসতে হাসতে গেয়েছিলো ‘অধরা ভানুটি, ছেড়েছে ছন্দপতনে..’ পরের বারে এই শেখাটাকেই কাজে লাগিয়ে আসবো তোমার কোলে । কথা দিলাম ভানুটি তোমায়…….

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 
5 Comments

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *